BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (বীমা কোম্পানি)

অনেক মানুষের কাছ থেকে অল্প অল্প প্রিমিয়াম নিয়ে একটা তহবিল বানানো, আর যাঁদের ক্ষতি হয় তাঁদের সেখান থেকে টাকা দেওয়া। এই সহজ ধারণার ওপর পুরো ইন্স্যুরেন্স ব্যবসা দাঁড়িয়ে।

ভিডিও আসছে
ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি: অনেকের টাকায় অল্প কয়েকজনের বিপদ সামলানো

ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কী

ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এমন একটা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যা আপনার রিস্ক নিজের কাঁধে নেয়, বিনিময়ে প্রিমিয়াম নেয়। আপনি নিয়মিত একটা ছোট নিশ্চিত খরচ করেন, আর কোম্পানি কথা দেয় যে বড় কোনো অনিশ্চিত ক্ষতি (মৃত্যু, দুর্ঘটনা, আগুন, অসুখ) হলে চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেবে। এই কথা বা চুক্তিকে বলে পলিসি।

বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি দুই ধরনের। লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করে: মৃত্যু হলে পরিবার টাকা পায়, অনেক পলিসিতে মেয়াদ শেষে টাকাও ফেরত আসে। নন-লাইফ বা জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি সম্পদ আর অন্যান্য রিস্ক নিয়ে কাজ করে: গাড়ি, কারখানায় আগুন, জাহাজে আমদানি করা মাল, ভ্রমণ ইত্যাদি।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক একটা এলাকার ১,০০০ জন মোটরসাইকেল মালিক প্রত্যেকে বছরে ২,০০০ টাকা প্রিমিয়াম দেন। তহবিলে জমা হয় ২০ লাখ টাকা। বছরে হয়তো ১০ জনের বড় দুর্ঘটনা হয়, প্রত্যেকের ক্ষতি ১,৫০,০০০ টাকা। কেউ জানে না সেই ১০ জন কারা হবেন, কিন্তু সবাই মিলে ছোট খরচ করে প্রত্যেকে বড় ক্ষতির ভয় থেকে মুক্ত থাকেন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • পলিসি আসলে একটা প্রতিশ্রুতি: সেটা কতটা কাজে আসবে, তা নির্ভর করে কোম্পানি দরকারের সময় দাবি মেটাতে পারবে কি না তার ওপর। তাই কোম্পানি কীভাবে চলে, তা বোঝা জরুরি।
  • প্রোটেকশন আর ইনভেস্টমেন্ট আলাদা করতে: প্রিমিয়ামের একটা অংশ যায় রিস্ক কভারে আর কোম্পানির খরচে। তাই সঞ্চয়-ধাঁচের পলিসির রিটার্ন অন্য সঞ্চয়ের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না।
  • ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি নিজেরাই বড় ইনভেস্টর: প্রিমিয়ামের টাকা তারা সরকারি সিকিউরিটিজ, ব্যাংক ডিপোজিট আর শেয়ারে রাখে। তাই সুদের হার আর শেয়ারবাজার বদলালে এদের আয়ও বদলায়।
  • ডিএসইতে অনেক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তালিকাভুক্ত: শেয়ারহোল্ডার হিসেবে দেখলে এদের ব্যবসার মডেল (প্রিমিয়াম, দাবি, খরচ, ইনভেস্টমেন্ট আয়) না বুঝে দাম বিচার করা কঠিন।

ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কীভাবে আয় করে

আয়ের প্রথম উৎস আন্ডাররাইটিং: সংগ্রহ করা প্রিমিয়াম থেকে দাবি পরিশোধ, এজেন্টের কমিশন আর অফিস খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে। রিস্ক ঠিকভাবে মাপতে না পারলে, বা প্রতিযোগিতায় প্রিমিয়াম খুব কম ধরলে, এখানে লোকসান হতে পারে।

দ্বিতীয় উৎস ইনভেস্টমেন্ট আয়। প্রিমিয়াম আগে আসে, দাবি আসে পরে, কখনো বহু বছর পরে। মাঝের এই সময়ে টাকাটা কোম্পানির হাতে থাকে, যাকে ইংরেজিতে "ফ্লোট" বলে, আর সেটা খাটিয়ে আয় হয়। ওয়ারেন বাফেটের ব্যবসার একটা বড় অংশ এই ফ্লোটের ওপর দাঁড়িয়ে, এটা বিখ্যাত উদাহরণ।

  • রিইন্স্যুরেন্স: খুব বড় রিস্ক (যেমন বড় কারখানা বা উড়োজাহাজ) একা না রেখে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তার একটা অংশ আরেক কোম্পানির কাছে বীমা করে। একে বলে রিইন্স্যুরেন্স, মানে "বীমা কোম্পানির বীমা"।

বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স খাত

বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স খাত নিয়ন্ত্রণ করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), যা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন ২০১০-এর অধীনে ২০১১ সালে কাজ শুরু করে। কোম্পানিগুলো চলে বীমা আইন ২০১০ অনুযায়ী। ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে ৩৬টি লাইফ আর ৪৬টি নন-লাইফ, মোট ৮২টি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ছিল।

কোম্পানির সংখ্যা বেশি হলেও খাতটা অর্থনীতির তুলনায় ছোট। মোট প্রিমিয়াম জিডিপির কত শতাংশ, তাকে বলে ইন্স্যুরেন্স পেনিট্রেশন। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালে বাংলাদেশে এটা মোটামুটি ০.৪% থেকে ০.৫৫%-এর মধ্যে ছিল, আর আইডিআরএর তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও এটা প্রায় ০.৫%। মানে, দেশের মোট আয়ের প্রতি ২০০ টাকায় প্রায় ১ টাকা যায় বীমার প্রিমিয়ামে।

  • ইনভেস্টমেন্টের নিয়ম: পলিসিহোল্ডারের টাকা যেন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় না যায়, তাই আইডিআরএ কোথায় কতটা রাখা যাবে তার নিয়ম দেয়। যেমন ২০১৯ সালের প্রবিধান অনুযায়ী নন-লাইফ কোম্পানিকে সম্পদের অন্তত ৭.৫% সরকারি সিকিউরিটিজে রাখতে হয়। এই ধরনের নিয়ম সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে।

হাতে-কলমে হিসাব

একটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির এক বছর (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)
  1. ধরা যাক ১,০০০ জন গ্রাহক প্রত্যেকে ২,০০০ টাকা প্রিমিয়াম দিলেন। মোট প্রিমিয়াম ২০,০০,০০০ টাকা।
  2. ১০টি দাবি, প্রতিটি ১,৫০,০০০ টাকা: মোট দাবি ১৫,০০,০০০ টাকা। কমিশন আর অফিস খরচ ৪,০০,০০০ টাকা।
  3. আন্ডাররাইটিং লাভ: ২০,০০,০০০ − ১৫,০০,০০০ − ৪,০০,০০০ = ১,০০,০০০ টাকা।
  4. দাবি দেওয়ার আগ পর্যন্ত গড়ে ১০ লাখ টাকা সরকারি সিকিউরিটিজ আর ডিপোজিটে খাটিয়ে ধরা যাক ৮% আয় হলো: ৮০,০০০ টাকা।

ফল: মোট লাভ প্রায় ১,৮০,০০০ টাকা, যার প্রায় অর্ধেক এসেছে ইনভেস্টমেন্ট থেকে। দাবি মাত্র তিনটা বেশি হলে আন্ডাররাইটিংয়ে লোকসান হতো। তাই রিস্ক ঠিকভাবে মাপা আর টাকা সাবধানে খাটানো, দুটোই সমান জরুরি। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • ইন্স্যুরেন্সকে প্রথমে ইনভেস্টমেন্ট ভাবা। এর মূল কাজ বড় ক্ষতি থেকে সুরক্ষা; রিটার্ন পরের বিষয়।
  • পলিসির শর্ত না পড়ে শুধু এজেন্টের মুখের কথায় ভরসা করা। দাবির সময় লিখিত শর্তই গোনা হয়।
  • "এত কোম্পানি আছে, সবই নিশ্চয়ই এক রকম" ভাবা। দাবি মেটানোর রেকর্ড আর আর্থিক অবস্থা কোম্পানিভেদে অনেক আলাদা হতে পারে।
  • প্রিমিয়াম কম দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া, কভারে কী আছে আর কী নেই তা না দেখে।
মনে রাখুন

ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি অনেকের প্রিমিয়াম দিয়ে অল্প কয়েকজনের ক্ষতি মেটায়; পলিসি একটা প্রতিশ্রুতি, যা কোম্পানির দাবি মেটানোর সামর্থ্যের মতোই শক্ত।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
আইডিআরএ ২০১১ সালে কাজ শুরু, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন ২০১০: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, "Reviving the insurance sector", ৩১ মার্চ ২০২১ ↗
বীমা আইন ২০১০
৩৬টি লাইফ ও ৪৬টি নন-লাইফ কোম্পানি, পেনিট্রেশন প্রায় ০.৫% (আইডিআরএর তথ্য): দ্য ডেইলি স্টার, "Corruption-plagued insurance sector overlooked in reforms", ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ↗
পেনিট্রেশন ২০১৮–২০২২ (০.৫৫% থেকে ০.৪০%): দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, "Insurance penetration slows though premiums bloat", ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ↗
নন-লাইফ কোম্পানির সম্পদের অন্তত ৭.৫% সরকারি সিকিউরিটিজে (আইডিআরএ প্রবিধান ২০১৯): দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২০ নভেম্বর ২০১৯ ↗
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।