মার্জিন অব সেফটি কী
কোনো শেয়ারের মূল্য আপনি যতই যত্ন নিয়ে আন্দাজ করুন, ভবিষ্যৎ কেউ নিশ্চিত জানে না। মার্জিন অব সেফটি মানে আন্দাজ করা মূল্যের চেয়ে যথেষ্ট কম দামে কেনা, যাতে আন্দাজ কিছুটা ভুল হলে বা খারাপ সময় এলেও বড় ক্ষতি না হয়। বেঞ্জামিন গ্রাহাম আর ডেভিড ডড ১৯৩৪ সালে এই শব্দটি চালু করেন, আর গ্রাহাম লিখেছিলেন, মার্জিন অব সেফটি সব সময় নির্ভর করে কত দাম দেওয়া হলো তার ওপর।
ওয়ারেন বাফেট এটা বোঝাতে একটা সেতুর উপমা দিয়েছেন: সেতু বানালে আপনি নিশ্চিত হন যে এটা ৩০,০০০ পাউন্ড ভার বইতে পারবে, কিন্তু তার ওপর দিয়ে চালান ১০,০০০ পাউন্ডের ট্রাক। ইনভেস্টিংয়েও একই নীতি: সব হিসাব একদম ঠিক হলে তবেই লাভ হবে, এমন জায়গায় টাকা না রাখা।
ধরা যাক ঢাকা বিমানবন্দরে যেতে সাধারণত এক ঘণ্টা লাগে। কিন্তু ফ্লাইট ধরতে হলে কেউ ঠিক এক ঘণ্টা আগে বের হন না; জ্যাম, বৃষ্টি বা গাড়ি নষ্ট হওয়ার কথা ভেবে দুই-তিন ঘণ্টা হাতে রাখেন। প্রতিদিন হয়তো সেই বাড়তি সময় লাগে না, কিন্তু যেদিন লাগে, সেদিন ফ্লাইট মিস হয় না। শেয়ার কেনায় মার্জিন অব সেফটি ঠিক এই বাড়তি সময়ের মতো। উদাহরণটি কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- আন্দাজ ভুল হয়: মূল্যের হিসাব ভবিষ্যতের অনুমানের ওপর দাঁড়ানো, আর অনুমান প্রায়ই মেলে না।
- শুধু নিজের ভুল নয়, দুর্ভাগ্য থেকেও রক্ষা করে: মহামারি, কাঁচামালের দাম বা টাকার মান হঠাৎ বদলাতে পারে।
- স্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা কমায়: বেশি দাম দিলে ব্যবসা ভালো চললেও টাকা ফেরত না-ও আসতে পারে।
- শৃঙ্খলা তৈরি করে: আগে থেকে ঠিক করা দামের নিচে না এলে না কেনা, হুজুগে না কেনা।
মার্জিন কত বড় হওয়া উচিত
কোনো নির্দিষ্ট শতাংশের নিয়ম নেই। মার্জিন কত বড় রাখা যুক্তিসঙ্গত, তা নির্ভর করে আপনার আন্দাজ কতটা অনিশ্চিত তার ওপর। যে ব্যবসার আয় বহু বছর ধরে স্থির, দেনা কম আর বোঝা সহজ, তার মূল্যের আন্দাজে ভুলের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। নতুন, ওঠানামাপূর্ণ, বেশি দেনার, বা আপনার কাছে অপরিচিত ব্যবসায় ভুলের সম্ভাবনা বেশি, তাই বেশি জায়গা রাখা দরকার।
- আন্দাজের সবচেয়ে আশাবাদী সংখ্যা নয়, সতর্ক বা হতাশাবাদী সংখ্যার সঙ্গে দাম তুলনা করুন।
- যত বেশি অনুমানের ওপর মূল্য দাঁড়িয়ে আছে, তত বেশি জায়গা রাখার কথা ভাবুন।
দামের বাইরেও মার্জিন অব সেফটি
- কোম্পানির ব্যালান্স শিটে: কম দেনা আর হাতে নগদ থাকলে খারাপ বছর পার হওয়া সহজ। এটা ব্যবসার নিজস্ব মার্জিন।
- ব্যবসার মানে: টেকসই কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ থাকলে আয় হঠাৎ ধসে পড়ার সম্ভাবনা কম।
- নিজের জীবনে: ইমার্জেন্সি ফান্ড আলাদা রাখা, ধার করা টাকায় ইনভেস্ট না করা, আর শিগগিরই দরকার এমন টাকা শেয়ারে না রাখা, যাতে খারাপ সময়ে বাধ্য হয়ে কম দামে বেচতে না হয়।
সীমাবদ্ধতা
মার্জিন অব সেফটি ততটাই ভালো, যতটা ভালো মূল্যের আন্দাজ। আন্দাজই যদি অনেক ভুল হয়, তবে কাগজে-কলমের "৩০% মার্জিন" আসলে নেই। অনেক সময় দাম কম থাকে কারণ ব্যবসা সত্যিই খারাপ হচ্ছে; তখন যেটাকে মার্জিন মনে হচ্ছে, সেটা আসলে ফাঁদ।
আর বড় মার্জিনের অপেক্ষায় থাকলে অনেক সময় কেনার সুযোগই আসে না, বা কেনার পরে দাম মূল্যের কাছে পৌঁছাতে বহু বছর লাগে। এটা এমন একটা সুরক্ষা, যার দাম হলো ধৈর্য।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক "রূপসা ফুডস লিমিটেড" নামের একটা কাল্পনিক কোম্পানির শেয়ারের মূল্য আপনার আন্দাজে: হতাশাবাদী দৃশ্যে ৬০ টাকা, মাঝামাঝি ৮০ টাকা, আশাবাদী ১০০ টাকা।
- দাম ৭৫ টাকা হলে মাঝামাঝি আন্দাজের তুলনায় মার্জিন মাত্র (৮০ − ৭৫) ÷ ৮০ ≈ ৬%। আর হতাশাবাদী দৃশ্যটা সত্যি হলে আপনি মূল্যের চেয়ে ১৫ টাকা বেশি দিয়েছেন।
- দাম ৫৫ টাকা হলে মাঝামাঝি আন্দাজের তুলনায় মার্জিন (৮০ − ৫৫) ÷ ৮০ ≈ ৩১%, আর হতাশাবাদী দৃশ্যেও মূল্য (৬০ টাকা) দামের চেয়ে বেশি।
ফল: মার্জিন অব সেফটির আসল প্রশ্ন হলো, "খারাপ দৃশ্যটা সত্যি হলে কী হবে?" শুধু সেরা আন্দাজের সঙ্গে তুলনা করলে নিরাপত্তা আসলে যতটা, তার চেয়ে বেশি মনে হয়। দাম কবে মূল্যের কাছে যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "সব সময় ৩০% মার্জিন" ধরনের একটা নির্দিষ্ট নিয়ম সব কোম্পানিতে চাপানো।
- আশাবাদী আন্দাজের সঙ্গে দাম তুলনা করে মার্জিন বড় দেখানো।
- আগের সর্বোচ্চ দামের চেয়ে অনেক কম বলে মার্জিন আছে ভাবা। আগের দাম মূল্যের মাপকাঠি নয়।
- ধার করা টাকায় কিনে মার্জিনের সুরক্ষা নিজেই নষ্ট করা।
মূল্যের আন্দাজ ভুল হবে ধরে নিন, আর এমন দামে কিনুন যাতে খারাপ দৃশ্যেও বড় ক্ষতি না হয়: এটাই মার্জিন অব সেফটি।