অ্যাকাউন্টিং রেড ফ্ল্যাগ কী
একটা কোম্পানির মুনাফা কত হলো, তা পুরোপুরি "মাপা" সংখ্যা নয়। কোন বিক্রি কবে আয় হিসেবে ধরা হবে, কোন খরচ এখন দেখানো হবে আর কোনটা কয়েক বছরে ভাগ করা হবে, বাকি টাকার কতটা আদায় হবে, এসবে ম্যানেজমেন্টের বিচার-বিবেচনা লাগে। নিয়মের ভেতরে থেকেও তাই মুনাফা কিছুটা সুন্দর করে দেখানো যায়, আর নিয়ম ভাঙলে তো কথাই নেই।
অ্যাকাউন্টিং রেড ফ্ল্যাগ হলো সেইসব সংকেত, যেখানে খাতার এক অংশের সঙ্গে আরেক অংশ মেলে না। একটা রেড ফ্ল্যাগ মানেই প্রতারণা নয়; অনেক সময় এর পেছনে সাধারণ ব্যবসায়িক কারণ থাকে। কিন্তু কয়েকটা একসঙ্গে দেখা দিলে প্রশ্ন করা জরুরি।
ধরা যাক "রূপসা ফুডস লিমিটেড" নামের একটা কাল্পনিক কোম্পানি পরপর তিন বছর বলছে মুনাফা ৩০–৪০% করে বাড়ছে। অথচ ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে অপারেশন থেকে আসা নগদ টাকা প্রতি বছরই প্রায় শূন্য বা মাইনাস, আর ক্রেতাদের কাছে পাওনা টাকা বিক্রির চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়ছে। মুনাফা কাগজে আছে, কিন্তু ব্যাংকে আসছে না। কোম্পানি ও সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- আপনি যা জানেন, তার বেশিরভাগই কোম্পানির নিজের প্রকাশ করা হিসাব থেকে। সেই হিসাব ভুল হলে EPS, P/E, ROE, সব রেশিওই ভুল হবে।
- বড় পতনের আগে প্রায়ই খাতায় সংকেত থাকে: মুনাফা আর নগদের অমিল, বাড়তে থাকা ধার, দেরিতে রিপোর্ট।
- শুধু মুনাফা আর ডিভিডেন্ডের খবর দেখে সিদ্ধান্ত নিলে আপনি সেই অংশটাই দেখছেন, যেটা সবচেয়ে সহজে সাজানো যায়।
- সন্দেহ জাগলে আরও পড়ার, প্রশ্ন করার বা দূরে থাকার সুযোগ পান, যা পরে আফসোসের চেয়ে অনেক সস্তা।
মুনাফা আর নগদের অমিল
সবচেয়ে কাজের পরীক্ষাটা সহজ: ইনকাম স্টেটমেন্টের নিট মুনাফার পাশে ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টের "অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো" রাখুন, কয়েক বছর ধরে। এক বছর কম-বেশি হতেই পারে, কিন্তু বছরের পর বছর মুনাফা বেশি আর নগদ কম হলে প্রশ্ন জাগে, মুনাফাটা আসলে কোথায়।
- পাওনা (রিসিভেবল) বিক্রির চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়ছে: বিক্রি দেখানো হচ্ছে, কিন্তু টাকা আদায় হচ্ছে না।
- ইনভেন্টরি বা মজুত বিক্রির চেয়ে দ্রুত বাড়ছে: মাল বিক্রি হচ্ছে না, বা মজুতের মূল্য বেশি ধরা হচ্ছে।
- মুনাফার বড় অংশ "অন্যান্য আয়" বা এককালীন লাভ থেকে, যেমন জমি বা শেয়ার বিক্রি। মূল ব্যবসা দুর্বল হতে পারে।
- সাধারণ খরচকে "সম্পদ" হিসেবে দেখিয়ে কয়েক বছরে ভাগ করা (ক্যাপিটালাইজ করা), যাতে এ বছরের মুনাফা বেশি দেখায়।
অডিট আর প্রকাশের সংকেত
- অডিটরের রিপোর্টে "কোয়ালিফায়েড অপিনিয়ন", "এমফ্যাসিস অব ম্যাটার" বা "গোয়িং কনসার্ন" নিয়ে সংশয়: অডিটর নিজেই কোনো সমস্যা বা অনিশ্চয়তার কথা লিখছেন।
- ঘন ঘন অডিটর বদল, অ্যাকাউন্টিং নীতি বদল, বা বার্ষিক রিপোর্ট ও এজিএম দেরিতে হওয়া।
- রিলেটেড পার্টি লেনদেন বড় হওয়া: পরিচালকদের নিজেদের অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কেনাবেচা, ঋণ বা অগ্রিম।
- নোট বা টীকাগুলো অস্পষ্ট, বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। আসল খবর প্রায়ই নোটেই থাকে।
এনরন আর ওয়্যারকার্ড থেকে শিক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের এনরন ছিল বিশাল এনার্জি কোম্পানি। পার্টনারশিপ আর "স্পেশাল পারপাস এনটিটি" ব্যবহার করে বড় লোকসান আর ধার হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল। নভেম্বর ২০০১-এ কোম্পানি ১৯৯৭ সাল থেকে মুনাফা ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার কমিয়ে নতুন করে দেখায়, আর ২ ডিসেম্বর ২০০১-এ দেউলিয়া হওয়ার আবেদন করে। জানুয়ারি ২০০১-এ যে শেয়ার ৮০ ডলারের বেশিতে কেনাবেচা হতো, এক বছর পরে তার দাম ছিল ৭০ সেন্টেরও কম।
জার্মানির পেমেন্ট কোম্পানি ওয়্যারকার্ড জুন ২০২০-এ দেউলিয়া হওয়ার আবেদন করে, যখন জানা যায় ব্যালান্স শিটে দেখানো প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ইউরো নগদ টাকার খোঁজ নেই, সম্ভবত কখনো ছিলই না। দুটো ঘটনারই শিক্ষা এক: বড় নাম, দ্রুত বৃদ্ধি বা নামী অডিটর থাকলেই হিসাব নিরাপদ নয়।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক রূপসা ফুডসের বিক্রি এক বছরে ১০০ কোটি থেকে বেড়ে ১২০ কোটি টাকা হলো, মানে ২০% বৃদ্ধি। একই সময়ে ক্রেতাদের কাছে পাওনা ১৫ কোটি থেকে বেড়ে ৩৬ কোটি টাকা, মানে ১৪০% বৃদ্ধি।
- পাওনা আদায়ের দিন = পাওনা ÷ বিক্রি × ৩৬৫। আগের বছর: ১৫ ÷ ১০০ × ৩৬৫ ≈ ৫৫ দিন।
- এ বছর: ৩৬ ÷ ১২০ × ৩৬৫ ≈ ১১০ দিন।
ফল: ক্রেতারা টাকা দিতে আগের প্রায় দ্বিগুণ সময় নিচ্ছে। হয়তো বাকিতে বেশি বিক্রি করে বিক্রি বাড়ানো হয়েছে, হয়তো কিছু পাওনা কখনো আদায়ই হবে না। এটা প্রমাণ নয়, কিন্তু অ্যানুয়াল রিপোর্টের নোটে কারণ খোঁজার মতো প্রশ্ন।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু EPS আর ডিভিডেন্ড দেখা, ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট আর অডিটরের রিপোর্ট না পড়া।
- একটা রেড ফ্ল্যাগ দেখেই "জালিয়াতি" ধরে নেওয়া, বা উল্টোভাবে অনেকগুলো একসঙ্গে দেখেও "নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে" বলে এড়িয়ে যাওয়া।
- বড় নাম, নামী অডিটর বা দ্রুত বৃদ্ধিকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভাবা।
- শুধু এক বছরের হিসাব দেখা। প্রবণতা বুঝতে কয়েক বছর পাশাপাশি রাখতে হয়।
মুনাফার পাশে সবসময় নগদ টাকা মিলিয়ে দেখুন: বছরের পর বছর মুনাফা আছে কিন্তু নগদ আসছে না, এটাই সবচেয়ে পরিচিত রেড ফ্ল্যাগ।