মূল ধারণা
প্রতিটি অ্যাসেটের রিটার্ন আসে আলাদা উৎস থেকে। শেয়ারের রিটার্ন নির্ভর করে কোম্পানির মুনাফার ওপর, আর মুনাফা অর্থনীতির সঙ্গে ওঠানামা করে। বন্ড আর এফডিআরের আয় আগে থেকে ঠিক করা থাকে, তাই এগুলো ইন্টারেস্ট রেটের দিকে বেশি সংবেদনশীল। সোনার কোনো আয় নেই; এর দাম চলে চাহিদা, ডলার আর মানুষের ভয়-ভরসার ওপর।
তাই অর্থনীতির একই খবর বিভিন্ন অ্যাসেটে বিভিন্নভাবে লাগে। মন্দার খবরে শেয়ার কমতে পারে, কিন্তু একই সময়ে রেট কমার আশায় আগে কেনা বন্ডের দাম বাড়তে পারে। এখানে যা বলা হচ্ছে তা সাধারণ প্রবণতা; প্রতিটি সাইকেল আলাদা, আর বাজার প্রায়ই প্রত্যাশার আগে বা পরে নড়ে।
ধরা যাক নাসরিন আর তানভীর দুজনেরই ৫ লাখ টাকা আছে। নাসরিনের পুরোটা শেয়ারে, তানভীর অর্ধেক শেয়ারে আর অর্ধেক এফডিআরে রেখেছেন। মন্দার এক বছরে নাসরিনের পোর্টফোলিও অনেকটা কমে গেল; তানভীরেরও কমল, তবে এফডিআরের অংশ স্থির থাকায় অনেক কম। পরের রিকভারিতে আবার নাসরিনের পোর্টফোলিও বেশি বাড়তে পারে। কোনটা "ভালো" তা নির্ভর করে কার কতটা ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য আর সময় আছে তার ওপর। ঘটনাটা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- প্রত্যাশা ঠিক রাখতে: শেয়ার যে মন্দায় অনেকটা কমতে পারে, তা আগে থেকে জানা থাকলে পতন দেখে হঠাৎ ভয় কম লাগে।
- ডাইভারসিফিকেশনের কারণ বুঝতে: যেসব অ্যাসেট একসঙ্গে ওঠানামা করে না, সেগুলো মিশিয়ে রাখলে পুরো পোর্টফোলিওর ওঠানামা কমে।
- টাকার দরকারের সময় মেলাতে: মন্দায় চাকরি বা আয়ের ঝুঁকি বাড়ে, আর ঠিক তখনই শেয়ারের দাম কম থাকতে পারে। কাছাকাছি সময়ে দরকারি টাকা কোথায় থাকবে, তা ভাবা জরুরি।
- রেটের পরিবর্তন বুঝতে: সাইকেলের সঙ্গে পলিসি রেট বদলায়, আর তাতে এফডিআরের নতুন হার আর বন্ডের দাম দুটোই বদলায়।
সাধারণ প্রবণতা, অ্যাসেট অনুযায়ী
- শেয়ার: বুমে মুনাফা বাড়ে, দামও সাধারণত বাড়ে; মন্দায় উল্টো। বাজার সামনের দিকে তাকায়, তাই শেয়ার প্রায়ই মন্দা শুরুর আগেই কমে, আর অর্থনীতি ঠিক হওয়ার আগেই আবার বাড়তে শুরু করে।
- বন্ড ও সরকারি সিকিউরিটিজ: মন্দায় রেট কমলে আগে কেনা বন্ডের দাম সাধারণত বাড়ে। কিন্তু ইনফ্লেশন বেশি থাকলে রেট বাড়ে, তখন বন্ডের দাম কমে।
- এফডিআর ও সঞ্চয়: টাকার অঙ্ক কমে না, তাই মন্দায় তুলনামূলক স্থির। তবে নতুন এফডিআরের হার পলিসি রেটের পিছু পিছু চলে, আর ইনফ্লেশন বেশি হলে আসল রিটার্ন কমে যায়।
- জমি ও ফ্ল্যাট: দাম ধীরে বদলায়, প্রতিদিন দেখা যায় না। মন্দায় দাম থমকে যেতে পারে আর বিক্রি করতে সময় লাগতে পারে।
- সোনা: সংকটের সময় অনেকে সোনাকে "নিরাপদ আশ্রয়" ভাবেন, আর কখনো কখনো দাম বাড়েও। কিন্তু এটা নিশ্চিত নয়; ডলার আর রেটের ওঠানামাও সোনার দামে বড় ভূমিকা রাখে।
- নগদ: দাম ওঠানামা করে না, তাই মন্দায় মানসিক স্বস্তি দেয়। কিন্তু ইনফ্লেশনে কেনার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে।
ইতিহাস থেকে কয়েকটা উদাহরণ
যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৭–০৯-এর গ্রেট রিসেশনে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ শেয়ার সূচক অক্টোবর ২০০৭-এর চূড়া থেকে মার্চ ২০০৯-এর তলানি পর্যন্ত প্রায় ৫৭% কমে, আর বাড়ির দাম ২০০৬-এর মাঝামাঝি থেকে ২০০৯-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত গড়ে প্রায় ৩০% কমে। একই সময়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার রেট ৫.২৫% থেকে নামিয়ে আনে ০–০.২৫%-এ।
কোভিডের শুরুতে, এপ্রিল ২০২০-এ বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো রেট ৫.৭৫% থেকে কমিয়ে ৫.২৫% করে, আর ব্যাংকের ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) ৫% থেকে কমিয়ে ৪% করে, যাতে ব্যাংকগুলোর হাতে লোন দেওয়ার টাকা বাড়ে। মন্দার সময় রেট কমানো আর ব্যাংকে টাকা জোগানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচিত পদক্ষেপ।
সব মন্দা এক রকম নয়
চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে মন্দা হলে সাধারণত ইনফ্লেশনও কমে, রেট কমে, আর বন্ড শেয়ারের পতন কিছুটা সামলায়। কিন্তু জ্বালানির দাম বা অন্য খরচ বাড়ার কারণে প্রবৃদ্ধি কমলে ইনফ্লেশন বেশি থাকতে পারে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেট বাড়ায়, আর শেয়ার ও বন্ড একসঙ্গে কমতে পারে। তাই অতীতের একটা মন্দায় যা হয়েছে, পরেরটায় হুবহু তা-ই হবে, এমন ধরে নেওয়া যায় না।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক মন্দার এক বছরে শেয়ারের দাম ৩০% কমল, আর এফডিআরে বছরে ৯% সুদ পাওয়া গেল। হিসাব সহজ রাখতে কর বাদ রাখা হলো। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
- পোর্টফোলিও ক: ৫,০০,০০০ টাকার পুরোটা শেয়ারে। বছর শেষে: ৫,০০,০০০ × ০.৭০ = ৩,৫০,০০০ টাকা, মানে ৩০% কম।
- পোর্টফোলিও খ: ৩,০০,০০০ টাকা শেয়ারে, ২,০০,০০০ টাকা এফডিআরে। বছর শেষে শেয়ার ২,১০,০০০ আর এফডিআর ২,১৮,০০০ টাকা; মোট ৪,২৮,০০০ টাকা।
ফল: পোর্টফোলিও খ কমেছে প্রায় ১৪.৪%, পোর্টফোলিও ক ৩০%। আবার শেয়ার বাড়ার বছরে ক বেশি বাড়বে। মিশ্রণটা ওঠানামা কমায়, রিটার্নের নিশ্চয়তা দেয় না।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- সাধারণ প্রবণতাকে নিশ্চিত নিয়ম ভাবা, যেমন "মন্দায় সোনা সবসময় বাড়ে"।
- গত বছর যে অ্যাসেট সবচেয়ে ভালো করেছে, সাইকেল ঘুরে যাওয়ার পরও সেটার পেছনে ছোটা।
- অর্থনীতির খারাপ খবর আসার পর শেয়ার বিক্রি করা, যখন বাজার হয়তো আগেই সেটা দামে ধরে ফেলেছে।
- কাছাকাছি সময়ে লাগবে এমন টাকা এমন অ্যাসেটে রাখা, যার দাম ঠিক মন্দার সময়েই সবচেয়ে বেশি কমতে পারে।
সাইকেলের সঙ্গে সব অ্যাসেট একভাবে চলে না। কোনটা কখন চাপে পড়ে বুঝে রাখলে প্রত্যাশা ঠিক থাকে, আর মিশিয়ে রাখার কারণটাও পরিষ্কার হয়।