ভুল থেকে শেখা মানে কী
ইনভেস্টিংয়ে ভুল থেকে শেখা মানে প্রতিটা বড় সিদ্ধান্তের পরে সৎভাবে দেখা: কী ভেবে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম, কী ঘটল, আর পরেরবার কী আলাদা করব। শুধু "লোকসান হয়েছে, আর ওদিকে যাব না" ভাবা শেখা নয়; সেটা প্রায়ই ভুল শিক্ষা।
সমস্যা হলো, ইনভেস্টিংয়ে ফল আসে দেরিতে আর তাতে ভাগ্যের ভূমিকা বড়। ভালো সিদ্ধান্তেও লোকসান হতে পারে, আবার একেবারে আন্দাজে নেওয়া সিদ্ধান্তেও লাভ হতে পারে। তাই শুধু ফল দেখে বিচার করলে ভুল জিনিস শেখা খুব সহজ।
ধরা যাক নাদিয়া এক আত্মীয়ের টিপ শুনে কোনো খোঁজ না নিয়েই একটা শেয়ার কিনলেন, আর তিন মাসে ৩০% লাভ হলো। তিনি ভাবলেন, "আমার অনুমান দারুণ!" পরের বার আরও বেশি টাকা দিয়ে একইভাবে কিনলেন, আর বড় লোকসান হলো। আসল ভুলটা দ্বিতীয়বারে হয়নি, হয়েছিল প্রথমবারেই: খোঁজ না নিয়ে কেনা। প্রথমবারের লাভ সেই ভুলটা ঢেকে দিয়েছিল। এটা একটা কাল্পনিক উদাহরণ।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- একই ভুল বারবার না করতে: অনেক লোকসান আসে একই ধরনের ভুল থেকে, যেমন গুজবে কেনা বা এক জায়গায় সব টাকা রাখা।
- ভাগ্য আর দক্ষতা আলাদা করতে: ভাগ্যের লাভকে দক্ষতা ভাবলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, রিস্কও বাড়ে।
- ভুল শিক্ষা এড়াতে: একবার লোকসান হলেই পুরো একটা ইনভেস্টমেন্টের ধরন থেকে চিরকালের মতো দূরে থাকা দরকার নয়; দেখতে হবে ভুলটা কোথায় ছিল।
- ছোট ভুলের দামে শেখা: অল্প টাকায় শুরুর দিকে ভুল থেকে শিখলে বড় টাকার সময় সেই ভুলটা এড়ানো যায়।
ভালো সিদ্ধান্ত বনাম ভালো ফল
মনোবিজ্ঞানী জোনাথন ব্যারন আর জন হার্শি ১৯৮৮ সালের এক গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, মানুষ একই সিদ্ধান্তকে বেশি ভালো বলে যখন তার ফল ভালো হয়, আর খারাপ বলে যখন ফল খারাপ হয়, যদিও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তথ্য একই ছিল। একে বলে আউটকাম বায়াস। যাঁরা মুখে বলেছিলেন ফল দেখে বিচার করা উচিত নয়, তাঁদের মধ্যেও এটা দেখা গেছে।
তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত "লাভ হলো কি না" নয়, বরং "যা জানতাম আর যা জানা সম্ভব ছিল, তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তটা কি যুক্তিসংগত ছিল?"
- ভালো সিদ্ধান্ত, খারাপ ফল: খোঁজখবর নিয়ে, নিজের সীমার মধ্যে ইনভেস্ট করলেন, তবু অপ্রত্যাশিত কারণে দাম পড়ল। এটা দুর্ভাগ্য, ভুল নয়।
- খারাপ সিদ্ধান্ত, ভালো ফল: গুজবে সব টাকা দিলেন আর লাভ হলো। এটা সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ ভুলটা পুরস্কার পেয়েছে।
"আমি তো জানতাম!" ফাঁদ
কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে মনে হয়, এটা তো আগেই বোঝা উচিত ছিল। মনোবিজ্ঞানী বারুক ফিশহফ ১৯৭৫ সালে দেখিয়েছিলেন, ফল জানার পরে মানুষ সেই ফলকে আগের চেয়ে অনেক বেশি "নিশ্চিত" ভাবে। একে বলে হাইন্ডসাইট বায়াস।
ইনভেস্টিংয়ে এর দুটো ক্ষতি। বাজার পড়ার পরে মনে হয় "আমি তো জানতাম", ফলে নিজের ভবিষ্যৎ বলার ক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস জন্মায়। আবার লোকসানের পরে নিজেকে অকারণে দোষ দেওয়া হয়, এমন কিছুর জন্য যা আসলে তখন জানা সম্ভব ছিল না। এর সবচেয়ে ভালো ওষুধ হলো সিদ্ধান্তের সময়েই লিখে রাখা।
একটা সহজ ইনভেস্টমেন্ট ডায়েরি
একটা খাতা বা ফোনের নোটই যথেষ্ট। প্রতিটা বড় কেনা বা বেচার দিন কয়েক লাইন লিখুন, আর ছয় মাস বা এক বছর পরে ফিরে পড়ুন। তখন নিজের আসল চিন্তাটা দেখতে পাবেন, পরে বানানো গল্পটা নয়।
- কী কিনলাম বা বেচলাম, কত টাকার, আর তারিখ।
- কেন: এক-দুই লাইনে মূল কারণ, আর তথ্যটা কোথা থেকে পেলাম (নিজে পড়ে, নাকি কারও কথায়)।
- কী হলে বুঝব আমি ভুল ছিলাম: আগে থেকে লেখা থাকলে পরে নিজেকে ঠকানো কঠিন।
- তখন মনের অবস্থা কেমন ছিল: শান্ত, উত্তেজিত, ভয় পাওয়া, নাকি "মিস করে ফেলব" ভাবনায় তাড়াহুড়ো।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু লাভ-লোকসান দেখে সিদ্ধান্তকে ভালো বা খারাপ বলা।
- লোকসান হলে বাজার, ব্রোকার বা "বড় খেলোয়াড়"-দের দোষ দেওয়া, আর লাভ হলে নিজের কৃতিত্ব ভাবা।
- লজ্জায় ভুলের কথা চেপে যাওয়া, এমনকি নিজের কাছেও। যে ভুল স্বীকার করা হয়নি, তা থেকে শেখাও যায় না।
- একবার লোকসানের পরে ঠিক উল্টো দিকে চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া, যেমন সব ইনভেস্টমেন্ট থেকে চিরকালের মতো সরে আসা।
ফল দেখে নয়, সিদ্ধান্তের মান দেখে বিচার করুন, আর সিদ্ধান্তের দিনই কারণটা লিখে রাখুন, যাতে পরে নিজের কাছে সৎ থাকতে পারেন।