ইনডেক্স ফান্ড কী
ইনডেক্স ফান্ড হলো এক ধরনের মিউচুয়াল ফান্ড বা ইটিএফ, যার একটাই কাজ: কোনো একটা স্টক ইনডেক্স বা সূচককে অনুসরণ করা। সূচকে যে কোম্পানিগুলো আছে, ফান্ড সেগুলোই কেনে, আর সূচকে যার ওজন বেশি, ফান্ডেও তার ভাগ বেশি। কোন কোম্পানি ভালো আর কোনটা খারাপ, ম্যানেজার সেই বিচার করেন না।
ধারণাটা নতুন নয়। ১৯৭৬ সালে আমেরিকায় জন বোগল সাধারণ ইনভেস্টরদের জন্য এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক অনুসরণ করা একটা ফান্ড চালু করেন। শুরুতে লক্ষ্য ছিল ১৫ কোটি ডলার, উঠেছিল মাত্র ১.১৩ কোটি ডলার। পরে এই ধরনের ফান্ড বিশ্বজুড়ে খুব জনপ্রিয় হয়।
ধরা যাক আপনি মায়ের রান্না করা বিরিয়ানির রেসিপি হুবহু কপি করছেন: চাল যতটা, মাংস যতটা, মশলা যতটা, ঠিক সেই অনুপাতে। নিজের মতো করে কিছু বদলান না। স্বাদ মায়েরটার খুব কাছাকাছি হবে, তবে হাঁড়ি আর চুলা আলাদা বলে একেবারে এক হবে না। ইনডেক্স ফান্ড সূচকের "রেসিপি" এভাবেই কপি করে।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- কী কিনছেন জানতে: ইনডেক্স ফান্ড কেনা মানে সূচকের সব কোম্পানি তাদের ওজন অনুযায়ী কেনা। সূচকে কয়েকটা বড় কোম্পানির ওজন বেশি হলে আপনার টাকারও বড় অংশ সেখানেই যায়।
- খরচ বুঝতে: সূচক নিজে কোনো ফি দেয় না, ফান্ড দেয়। তাই ফান্ডের রিটার্ন সাধারণত সূচকের চেয়ে একটু কম হয়।
- ফান্ড তুলনা করতে: একই সূচক অনুসরণ করা দুটো ফান্ডের মধ্যে পার্থক্য মূলত খরচ আর সূচককে কতটা নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে, তাতে।
- প্রত্যাশা ঠিক রাখতে: ইনডেক্স ফান্ড সূচককে হারানোর চেষ্টা করে না। সূচক পড়লে ফান্ডও পড়বে, এটাই এর নকশা।
ফান্ড কীভাবে সূচককে অনুসরণ করে
সবচেয়ে সরল পদ্ধতি হলো "ফুল রেপ্লিকেশন": সূচকের প্রতিটি শেয়ার ঠিক সূচকের ওজনে কেনা। সূচকে কোনো কোম্পানির ওজন ৮% হলে, ফান্ডের টাকারও প্রায় ৮% সেই কোম্পানিতে থাকে। সূচকে শেয়ার অনেক বেশি হলে, বা কিছু শেয়ার কম লেনদেন হলে, ফান্ড "স্যাম্পলিং" করতে পারে: সব না কিনে এমন একটা অংশ কেনে, যার আচরণ পুরো সূচকের কাছাকাছি।
সূচক নিজেও সময়ের সঙ্গে বদলায়। স্টক এক্সচেঞ্জ নির্দিষ্ট নিয়মে নিয়মিত সূচক পর্যালোচনা করে: কোনো কোম্পানি বাদ পড়ে, নতুন কোম্পানি ঢোকে, ওজন বদলায়। তখন ইনডেক্স ফান্ডকেও সেই অনুযায়ী শেয়ার কেনাবেচা করতে হয়, আর ইনভেস্টররা টাকা জমা দিলে বা তুললেও ফান্ড একই অনুপাতে কেনে বা বেচে।
ফান্ড কেন সূচকের হুবহু সমান হয় না
সূচক কাগজে-কলমে একটা হিসাব; ফান্ডকে আসল টাকায় আসল বাজারে কেনাবেচা করতে হয়। সূচকের রিটার্ন আর ফান্ডের রিটার্নের এই পার্থক্যকে বলে ট্র্যাকিং ডিফারেন্স, আর পার্থক্যটা সময়ের সঙ্গে কতটা ওঠানামা করে, তা মাপে ট্র্যাকিং এরর।
- ফি ও খরচ: ব্যবস্থাপনা ফি আর অন্যান্য খরচ প্রতি বছর ফান্ডের সম্পদ থেকে কাটা হয়।
- লেনদেন খরচ: সূচক বদলালে বা টাকা ঢুকলে-বেরোলে কেনাবেচায় ব্রোকারেজ আর অন্য খরচ লাগে।
- নগদ টাকা: ইনভেস্টরদের টাকা ফেরত দিতে ফান্ড কিছু নগদ রাখে। বাজার উঠলে সেই নগদ অংশ পিছিয়ে থাকে।
- সময়ের পার্থক্য: ডিভিডেন্ড বা সূচকের পরিবর্তন যখন হিসাবে ধরা হয়, ফান্ড ঠিক সেই মুহূর্তে কিনতে-বেচতে না-ও পারে।
বাংলাদেশে অবস্থা
বাংলাদেশে সূচকভিত্তিক ফান্ড খুব ধীরে এগিয়েছে। ২০২২ সালে ডিএসই জানিয়েছিল, প্রধানত ডিএস৩০ সূচকে বিনিয়োগ করা ইটিএফ আনার নীতিগত সম্মতি বিএসইসি দিয়েছে। কিন্তু পরে দেশে প্রথম যে ইটিএফ অনুমোদন পায়, সেটা সূচক অনুসরণ করা নয়, বরং ম্যানেজার-চালিত, আর ২০২৪ সালেও ইনভেস্টরের আগ্রহের অভাবে চালু হতে পারেনি। নতুন কোনো ফান্ড এলে বিএসইসি আর স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ তথ্য দেখে নেওয়া ভালো।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা সূচকে তিনটা কোম্পানি: ক-এর ওজন ৫০%, খ-এর ৩০%, গ-এর ২০%। ফান্ডে ১০ কোটি টাকা এলে ম্যানেজার ক-তে ৫ কোটি, খ-তে ৩ কোটি আর গ-তে ২ কোটি টাকার শেয়ার কেনেন।
- এক বছরে সূচক ১০% বাড়ল। কাগজে-কলমে ১,০০,০০০ টাকা হতো ১,১০,০০০ টাকা।
- ফান্ডের বার্ষিক খরচ ০.৫%, আর লেনদেন খরচ ও নগদ রাখার কারণে আরও ০.৩% পিছিয়ে থাকল। ফান্ডের রিটার্ন প্রায় ৯.২%: ১,০০,০০০ টাকা হলো প্রায় ১,০৯,২০০ টাকা।
ফল: ফান্ড সূচকের খুব কাছে, তবে প্রায় ৮০০ টাকা পিছিয়ে। এই ০.৮% হলো ট্র্যাকিং ডিফারেন্স। একই সূচকের দুটো ফান্ডের মধ্যে যেটার এই পার্থক্য কম, সেটা সূচককে বেশি নিখুঁতভাবে অনুসরণ করছে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ধরে নেওয়া যে ইনডেক্স ফান্ড সূচকের ঠিক সমান রিটার্ন দেবে। খরচ আর লেনদেনের কারণে সাধারণত একটু কম হয়।
- না দেখে ধরে নেওয়া যে "ইনডেক্স ফান্ড" মানে অনেক কোম্পানিতে সমানভাবে ছড়ানো। সূচকে কয়েকটা কোম্পানির ওজন বেশি হলে ফান্ডেও তাই।
- শুধু নাম দেখে ফান্ড বোঝা। কোন সূচক অনুসরণ করে, আর আসলেই সূচক অনুসরণ করে কি না, প্রসপেক্টাসে দেখতে হয়।
- একই সূচকের দুটো ফান্ড তুলনা করার সময় খরচ উপেক্ষা করা। একই জিনিস কিনলে পার্থক্য প্রায় পুরোটাই খরচে।
ইনডেক্স ফান্ড সূচকের রেসিপি কপি করে: রিটার্ন সূচকের কাছাকাছি, ঝুঁকিও সূচকের মতো, আর মাঝের ফাঁকটা মূলত খরচ।