টাইম হরাইজন আর লিকুইডিটি কী
টাইম হরাইজন মানে টাকাটা কত দিন পরে আপনার হাতে দরকার। ছয় মাস পরে বোনের বিয়ের খরচ, তিন বছর পরে বাইক কেনা, নাকি ২৫ বছর পরে অবসর, প্রতিটার হরাইজন আলাদা। হরাইজন যত লম্বা, মাঝপথের ওঠানামা সামলে নেওয়ার সময় তত বেশি।
লিকুইডিটি মানে কোনো ইনভেস্টমেন্টকে কত দ্রুত, কত কম খরচে আর দাম না হারিয়ে নগদ টাকায় বদলানো যায়। সেভিংস অ্যাকাউন্টের টাকা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তোলা যায়। জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে মাসের পর মাস লাগতে পারে, আর তাড়াহুড়ো করলে দাম কম পেতে হয়।
ধরা যাক রাফি আর তানিয়া দুজনেই ২,০০,০০০ টাকা শেয়ারে রাখলেন। রাফির টাকা লাগবে ২০ বছর পরে, তানিয়ার লাগবে আগামী বছর ছোট ভাইয়ের ভর্তির জন্য। বছর শেষে বাজার ২০% পড়ে গেলে রাফি অপেক্ষা করতে পারেন। তানিয়াকে হয়তো কম দামেই বেচতে হবে। একই ইনভেস্টমেন্ট, কিন্তু দুজনের জন্য রিস্ক একেবারে আলাদা। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- রিস্ক ঠিকভাবে বুঝতে: দাম ওঠানামা তখনই আসল লোকসান হয়, যখন খারাপ সময়ে বেচতে বাধ্য হন। কবে টাকা লাগবে, সেটাই ঠিক করে এই বাধ্যবাধকতা কতটা।
- জোর করে বেচার খরচ এড়াতে: মেয়াদের আগে ভাঙালে অনেক সঞ্চয় স্কিমে মুনাফা কমে যায়, আর তাড়াহুড়োয় বেচলে শেয়ার বা জমিতে কম দাম পেতে হয়।
- একেক লক্ষ্যের টাকা আলাদা ভাবতে: সব টাকা এক ঝুড়িতে না ভেবে, প্রতিটা লক্ষ্যের সময় অনুযায়ী আলাদা হিসাব রাখা সহজ হয়।
- শান্ত থাকতে: টাকা কবে লাগবে জানা থাকলে বাজার পড়লে আতঙ্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ কমে।
সময় অনুযায়ী টাকা ভাগ করে দেখা
অনেকে টাকাকে তিন ভাগে ভাবেন। কাছের টাকা (এক-দুই বছরের মধ্যে লাগবে), মাঝারি টাকা (মোটামুটি তিন থেকে পাঁচ বছর), আর দূরের টাকা (পাঁচ-দশ বছর বা তার বেশি)। সীমাগুলো কঠিন নিয়ম নয়, শুধু চিন্তা গুছিয়ে নেওয়ার উপায়।
কাছের টাকার ক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন হলো "দরকারের দিন পুরো টাকাটা পাব তো?" দূরের টাকার ক্ষেত্রে প্রশ্নটা বদলে যায়: "ইনফ্লেশনের চেয়ে বেশি বাড়বে তো?" কারণ লম্বা সময়ে মাঝপথের ওঠানামা সামলানোর সুযোগ থাকে, কিন্তু ইনফ্লেশনের ক্ষতি জমতে থাকে।
লিকুইডিটি হঠাৎ হারিয়ে যেতে পারে
শেয়ার সাধারণত লিকুইড ধরা হয়, কারণ যেকোনো কর্মদিবসে বেচার অর্ডার দেওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশেই দেখা গেছে, দরকারের সময় সেটা সবসময় সত্যি থাকে না। ২০২০ সালের প্রথম তিন মাসে ডিএসইএক্স প্রায় ১৯% পড়ে, ১৮ মার্চ নেমে আসে প্রায় ৩,৬০৩ পয়েন্টে। এরপর দেশজুড়ে লকডাউনের সময় লেনদেন কিছুদিন বন্ধ ছিল।
জুলাই ২০২২ থেকে জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ১৮ মাস নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি প্রায় সব শেয়ারে "ফ্লোর প্রাইস" বা সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দিয়েছিল। ওই দামের নিচে বেচা যেত না, তাই অনেক শেয়ারের ক্রেতা প্রায় ছিল না, আর বিনিয়োগকারীরা চাইলেও বেচতে পারেননি। ফ্লোর তুলে নেওয়ার পর সূচক ১৫%-এর বেশি পড়ে যায়।
- শিক্ষা: কোনো ইনভেস্টমেন্ট কাগজে লিকুইড হলেও, ঠিক যেদিন টাকা লাগবে সেদিন ভালো দামে বেচা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
লিকুইডিটিরও একটা দাম আছে
- যে টাকা যেকোনো সময় তোলা যায়, তাতে সাধারণত মুনাফা কম। টাকা লম্বা সময় আটকে রাখতে রাজি হলে সাধারণত বেশি হার দেওয়া হয়।
- মেয়াদি আমানত বা সঞ্চয়পত্র মেয়াদের আগে ভাঙালে সাধারণত কম হারে মুনাফা দেওয়া হয়। নিয়মগুলো স্কিম ও সময়ভেদে আলাদা আর বদলাতে পারে।
- জমি, ফ্ল্যাট বা নিজের ব্যবসার মতো জিনিস বেচতে সময় লাগে, দালাল ও কাগজপত্রের খরচ আছে, আর তাড়া থাকলে দর কষাকষির ক্ষমতা কমে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক এক বছর পরে ২,০০,০০০ টাকা লাগবে, আর পুরোটা শেয়ারে রাখা হলো।
- বছর শেষে বাজার ২০% নিচে: পোর্টফোলিওর মূল্য ১,৬০,০০০ টাকা। ৪০,০০০ টাকা কম।
- আগের জায়গায় ফিরতে ১,৬০,০০০ টাকাকে ২৫% বাড়তে হবে (২০% নয়), আর সেটা কত দিনে হবে কেউ জানে না।
ফল: ২০ বছরের লক্ষ্যে এই পতন হয়তো সামলে ওঠার সময় থাকে; এক বছরের লক্ষ্যে সেটা সরাসরি ৪০,০০০ টাকার ঘাটতি। রিস্ক শুধু ইনভেস্টমেন্টের নয়, আপনার সময়েরও। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ইনভেস্ট করার আগে "এই টাকা কবে লাগবে" প্রশ্নটাই না করা।
- ধরে নেওয়া যে শেয়ার বা অন্য কিছু যেকোনো দিন ভালো দামে বেচা যাবে।
- শুধু রিটার্ন দেখা, মেয়াদের আগে ভাঙানোর শর্ত আর খরচ না পড়া।
- লম্বা সময়ের টাকা এত সাবধানে রাখা যে তা ইনফ্লেশনের সঙ্গেও তাল মেলাতে পারে না।
ইনভেস্টমেন্ট বেছে নেওয়ার আগে জানুন টাকাটা কবে লাগবে: যত কাছের দরকার, দরকারের দিন পুরো টাকা পাওয়া তত গুরুত্বপূর্ণ।