ডিপোজিট আর লোন কী
আপনি ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে, সেটা আসলে ব্যাংককে দেওয়া একটা লোন। ব্যাংক আপনার কাছে ঋণী হয়: চাইলে বা মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত দেবে, সঙ্গে সুদ বা মুনাফা। ব্যাংকের হিসাবের খাতায় আপনার ডিপোজিট তাই তার দায় বা লায়াবিলিটি।
অন্যদিকে ব্যাংক ব্যবসায়ী, কৃষক, চাকরিজীবী বা কোম্পানিকে লোন দেয়। লোন ব্যাংকের অ্যাসেট, কারণ ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের কাছে ঋণী। ব্যাংক ডিপোজিটে যে হারে সুদ দেয়, লোনে তার চেয়ে বেশি হারে নেয়। এই পার্থক্যকে বলে স্প্রেড।
ধরা যাক সুমির বেতন প্রতি মাসে তাঁর সেভিংস অ্যাকাউন্টে আসে, আর তিনি কিছু টাকা এফডিআরে রাখেন। একই শহরে রফিক একটা মুদি দোকান বড় করতে ব্যাংক থেকে লোন নিলেন। সুমি আর রফিক পরস্পরকে চেনেন না, কিন্তু ব্যাংক দুজনকে যুক্ত করছে: সুমির মতো অনেকের জমা, রফিকের মতো অনেকের লোন। ঘটনাটা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- ডিপোজিটও একটা ঝুঁকি বুঝতে: জমা মানে ব্যাংককে লোন দেওয়া, তাই ব্যাংকের লোন ঠিকমতো ফেরত আসছে কি না, তা শেষ পর্যন্ত জমাকারীর ওপরও প্রভাব ফেলে।
- সুদের হার কেন আলাদা বুঝতে: ব্যাংক লোনে বেশি নেয় আর ডিপোজিটে কম দেয়, কারণ পার্থক্য থেকেই খরচ, খেলাপি লোনের ক্ষতি আর মুনাফা মেটায়।
- রেট কেন বদলায় বুঝতে: কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বদলালে ব্যাংকের টাকা জোগাড়ের খরচ বদলায়, তাই ডিপোজিট আর লোনের হারও ধীরে ধীরে বদলায়।
- সুরক্ষার সীমা জানতে: ব্যাংক বন্ধ হলে জমার একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক পর্যন্ত আইনগত সুরক্ষা আছে, তার বেশি নয়।
ব্যাংক কীভাবে আয় করে
ব্যাংকের প্রধান আয় স্প্রেড থেকে, সঙ্গে বিভিন্ন ফি আর চার্জ। খরচের দিকে আছে জমাকারীদের সুদ, কর্মী আর শাখার খরচ, আর খেলাপি লোনের জন্য আলাদা করে রাখা টাকা (প্রভিশন)। স্প্রেড থেকে এসব বাদ দিয়ে যা থাকে, সেটাই মুনাফা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য নিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ সব ব্যাংকের গড় (ওয়েটেড অ্যাভারেজ) ডিপোজিট রেট ছিল ৬.১৬%, লেন্ডিং রেট ১১.৮৬%, অর্থাৎ স্প্রেড ৫.৭০%। স্প্রেড সময়ের সঙ্গে বদলায়: ২০২৩-এর কয়েক মাসে তা ৩%-এর নিচে ছিল, ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ ৫%-এর ওপরে ওঠে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে সুদের বদলে মুনাফা ভাগাভাগির (মুদারাবা) কাঠামো থাকে, তবে জমা নিয়ে অর্থায়ন করার মূল ধারণা একই।
সূত্র: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২৬ আগস্ট ২০২৬ (বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য)
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| গড় হার | |
|---|---|
| আমানতের সুদ | ৬.২% |
| লোনের সুদ | ১১.৯% |
কেন ব্যাংককে রিজার্ভ রাখতে হয়
জমাকারী চাইলেই টাকা তুলতে পারেন, কিন্তু ব্যাংকের লোন অনেক বছর মেয়াদি। এই অমিলের কারণে ব্যাংকের হাতে সবসময় কিছু নগদ বা সহজে বিক্রি করা যায় এমন অ্যাসেট রাখতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এর জন্য দুটো নিয়ম ঠিক করে: ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর), যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়, আর স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রেশিও (এসএলআর), যা সরকারি সিকিউরিটিজের মতো তরল অ্যাসেটে রাখতে হয়।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিসেম্বর ২০২৫-এর প্রকাশনা অনুযায়ী সিআরআর ৪%, আর এসএলআর প্রচলিত ব্যাংকের জন্য ১৩% ও ইসলামী ব্যাংকের জন্য ৫.৫%। এই হারগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়ে সময়ে বদলায়।
- অনেক জমাকারী একসঙ্গে টাকা তুলতে চাইলে রিজার্ভ যথেষ্ট না-ও হতে পারে। তখন সুস্থ ব্যাংককে সাময়িক টাকা জোগাতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যাকে বলে লেন্ডার অব লাস্ট রিসর্ট।
লোন খেলাপি হলে, আর আপনার জমার সুরক্ষা
কিছু লোন সবসময়ই ফেরত আসে না। খেলাপি লোন বেশি হলে ব্যাংকের আয় কমে, প্রভিশন বাড়ে, আর ক্ষতি ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন থেকে মেটাতে হয়। মূলধন খুব কমে গেলে জমাকারীর টাকাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ কারণেই ব্যাংক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।
বাংলাদেশে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন হলে জমাকারীরা একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পান। আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী এই সীমা জমাকারী প্রতি ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে; এটা বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা করে। আইন আর সীমা ভবিষ্যতে বদলাতে পারে, তাই সর্বশেষ নিয়ম বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেখে নেওয়া ভালো।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা ব্যাংক ১০০ কোটি টাকা ডিপোজিট নিল, বছরে গড়ে ৬% সুদে। বছরে সুদ খরচ: ৬ কোটি টাকা। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
- রিজার্ভ আর তরল অ্যাসেট রাখার পর ধরা যাক ৮০ কোটি টাকা লোন দিল, বছরে ১২% সুদে। সুদ আয়: ৯.৬ কোটি টাকা।
- এর মধ্যে ২% লোন, মানে ১.৬ কোটি টাকা খেলাপি হলে, সেই আসল আর তার সুদ দুটোই হারানোর ঝুঁকি। আয় থেকে প্রভিশন রাখতে হয়।
ফল: কাগজে ৯.৬ − ৬ = ৩.৬ কোটি টাকার পার্থক্য, কিন্তু কর্মী, শাখা আর খেলাপি লোনের খরচ মেটানোর পর আসল মুনাফা এর চেয়ে অনেক কম। খেলাপি বাড়লে এই পার্থক্য দ্রুত মুছে যেতে পারে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ভাবা যে ব্যাংক আপনার জমা টাকা ভল্টে আলাদা করে রেখে দেয়। আসলে বেশিরভাগ টাকা লোন বা অন্য অ্যাসেটে খাটানো থাকে।
- শুধু সবচেয়ে বেশি ডিপোজিট রেট দেখা, প্রতিষ্ঠানটি কেন এত বেশি দিচ্ছে আর এর ঝুঁকি কী, তা না ভাবা।
- ধরে নেওয়া যে জমার পুরো অঙ্কই, যত বড়ই হোক, আইনগতভাবে সুরক্ষিত।
- ডিপোজিট রেট আর লোন রেটকে আলাদা জগৎ ভাবা। দুটোই একই পলিসি রেট আর একই ব্যাংকের খরচের সঙ্গে যুক্ত।
ডিপোজিট মানে ব্যাংককে দেওয়া লোন; ব্যাংক সেটা বেশি হারে আবার লোন দেয়, আর মাঝের পার্থক্য দিয়ে খরচ, ঝুঁকি আর মুনাফা মেটায়।