ধরন আর মেয়াদ বলতে কী বোঝায়
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে কয়েকটি স্কিম আছে, তবে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি কেনেন চারটি: ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র আর পেনশনার সঞ্চয়পত্র। চারটিতেই টাকা যায় সরকারের কাছে, কিন্তু মেয়াদ, মুনাফা পাওয়ার সময় আর কারা কিনতে পারবেন, তা আলাদা।
আরেকটা জিনিস অনেকে খেয়াল করেন না: মুনাফার হার একটা নয়, একটা তালিকা। প্রথম বছরের জন্য এক হার, দ্বিতীয় বছরের জন্য একটু বেশি, এভাবে বাড়তে বাড়তে মেয়াদপূর্তিতে সবচেয়ে বেশি। বিজ্ঞাপনে বা খবরে যে হার দেখেন, সাধারণত সেটা মেয়াদপূর্তির হার।
ধরা যাক দুই প্রতিবেশী, রুবিনা আর করিম সাহেব, দুজনেই সঞ্চয়পত্র কিনবেন। রুবিনার দরকার প্রতি মাসে সংসারে কিছু টাকা আসুক; তাঁর জন্য মাসিক মুনাফার স্কিম মানানসই। করিম সাহেবের এখন বাড়তি আয় দরকার নেই, পাঁচ বছর পরে মেয়ের বিয়ের খরচের জন্য একসঙ্গে বড় অঙ্ক চান; তাঁর জন্য মেয়াদ শেষে সব মুনাফা একসঙ্গে পাওয়ার স্কিম মেলে। একই "সঞ্চয়পত্র", কিন্তু দুজনের প্রয়োজন আলাদা। ঘটনাটা উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- নগদ টাকার প্রবাহ মেলাতে: মুনাফা মাসে, তিন মাসে, নাকি শেষে একবারে আসবে, তা আপনার সংসারের খরচের ছকের সঙ্গে মিলতে হবে।
- আগে ভাঙানোর খরচ বুঝতে: মেয়াদের আগে টাকা লাগলে কম হারে মুনাফা হিসাব হয়, আর প্রথম বছরের মধ্যে ভাঙালে প্রায় কিছুই মেলে না।
- যোগ্যতা আর সীমা জানতে: সব স্কিম সবার জন্য খোলা নয়, আর প্রতিটির আলাদা ক্রয়সীমা আছে।
- ঠিকভাবে তুলনা করতে: একটা স্কিমের প্রথম বছরের হার আরেকটার মেয়াদপূর্তির হারের সঙ্গে মেলালে ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে।
চার স্কিম একনজরে
স্কিমের আলাদা সীমা থাকলেও সব মিলিয়ে একটা মোট সীমাও আছে। ২০১৯ সালের পরিবর্তনের পর থেকে প্রথম তিনটি স্কিম মিলিয়ে একক নামে মোট ৫০ লাখ, যৌথ নামে ১ কোটি টাকার কথা খবরে এসেছে; পেনশনার স্কিমের হিসাব আলাদা। সীমাগুলো সরকারি প্রজ্ঞাপনে সময়ে সময়ে বদলায়, তাই কেনার আগে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর থেকে সর্বশেষ নিয়ম মিলিয়ে নিন।
- ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র: মেয়াদ ৫ বছর; পুরো মুনাফা মেয়াদ শেষে মূল টাকার সঙ্গে। প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ একক বা যৌথ নামে কিনতে পারেন। একক নামে স্কিমের সীমা ৩০ লাখ টাকা, যৌথ নামে ৬০ লাখ।
- ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র: মেয়াদ ৩ বছর; প্রতি তিন মাসে মুনাফা। একক নামে সীমা ৩০ লাখ, যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকা।
- পরিবার সঞ্চয়পত্র: মেয়াদ ৫ বছর; প্রতি মাসে মুনাফা। কিনতে পারেন ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আর ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী-পুরুষ। সীমা ৪৫ লাখ টাকা; জানুয়ারি ২০২৫ থেকে শুধু একক নামে, যৌথ নামে নয়।
- পেনশনার সঞ্চয়পত্র: মেয়াদ ৫ বছর; প্রতি তিন মাসে মুনাফা। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশনের এককালীন টাকা থেকে কেনেন। একক নামে সীমা ৫০ লাখ টাকা।
ধাপে ধাপে বাড়া হার: আগে ভাঙালে কী হয়
প্রতিটি স্কিমের জন্য সরকার বছরভিত্তিক একটা হারের তালিকা দেয়। যেমন, জুলাই ২০২৫ থেকে কেনা ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে (সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত স্তরে) প্রথম বছর শেষে ভাঙালে হার ছিল ৯.৭৪%, দ্বিতীয় বছরে ১০.২১%, তৃতীয় বছরে ১০.৭২%, চতুর্থ বছরে ১১.২৬%, আর মেয়াদপূর্তিতে ১১.৮৩%। ৩ মাস অন্তর মুনাফার স্কিমে একই সময়ে ধাপগুলো ছিল ১০.৬৫%, ১১.২২% আর মেয়াদপূর্তিতে ১১.৮২%।
এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে ভাঙালে সাধারণত কোনো মুনাফাই মেলে না। আর যেসব স্কিমে নিয়মিত (মাসে বা তিন মাসে) মুনাফা দেওয়া হয়, সেখানে মুনাফা দেওয়া হয় মেয়াদপূর্তির হারে; আগে ভাঙালে কম হারের সঙ্গে পার্থক্যটা সাধারণত মূল টাকা থেকে সমন্বয় করা হয়। কেনার দিনের তালিকাই পুরো মেয়াদে খাটে; পরে হার বদলালে তা শুধু নতুন কেনায় প্রযোজ্য।
সূত্র: ইউএনবি, জুলাই ২০২৫; হার বদলায়
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| বছরে মুনাফার হার | |
|---|---|
| ১ বছর পরে | ৯.৭% |
| ২ বছর পরে | ১০.২% |
| ৩ বছর পরে | ১০.৭% |
| ৪ বছর পরে | ১১.৩% |
| মেয়াদ শেষে (৫ বছর) | ১১.৮% |
মেয়াদ শেষে কী হয়
মেয়াদ শেষ হলে মূল টাকা (আর ৫ বছর মেয়াদি স্কিমে জমে থাকা পুরো মুনাফা) আপনার নিবন্ধিত ব্যাংক হিসাবে চলে আসে। আবার কিনতে চাইলে সেটা নতুন কেনা হিসেবে গণ্য হয়, তাই তখনকার হার, তখনকার ক্রয়সীমা আর তখনকার কর-নিয়ম খাটে, আগেরটা নয়।
- দুই স্তরের হার: জানুয়ারি ২০২৫ থেকে সব স্কিম মিলিয়ে আপনার মোট বিনিয়োগ সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে এক হার, তার বেশি হলে সামান্য কম হার। তাই নতুন কেনার আগে আগের সব সঞ্চয়পত্র মিলিয়ে মোট অঙ্কটা দেখা দরকার।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ১,০০,০০০ টাকার ৫ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র কিনলেন, আর হারের তালিকা জুলাই ২০২৫-এর মতো: মেয়াদপূর্তিতে ১১.৮৩%, দুই বছর পরে ভাঙালে ১০.২১%। ধরা যাক মুনাফা সরল হারে হিসাব হয়, আর কর বাদ দিয়ে দেখছি।
- পুরো ৫ বছর রাখলে: ১,০০,০০০ × ১১.৮৩% × ৫ = ৫৯,১৫০ টাকা মুনাফা।
- ২ বছর পরে ভাঙালে: ১,০০,০০০ × ১০.২১% × ২ = ২০,৪২০ টাকা। ওই দুই বছর মেয়াদপূর্তির হারে হিসাব হলে হতো ২৩,৬৬০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৩,২৪০ টাকা কম। ১০ মাসে ভাঙালে মুনাফা সাধারণত শূন্য।
ফল: সঞ্চয়পত্র কেনার আগে ভাবুন টাকাটা পুরো মেয়াদ রাখা যাবে কি না। হার, স্তর আর হিসাবের পদ্ধতি উদাহরণের জন্য ধরা; আসল তালিকা কেনার সময়ের প্রজ্ঞাপনে থাকে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- খবরে দেখা মেয়াদপূর্তির হারকে ধরে নেওয়া যে যেকোনো সময় ভাঙালেও এই হারই পাবেন।
- দুই বছর পরে লাগবে এমন টাকা ৫ বছরের স্কিমে রাখা, তারপর আগে ভাঙিয়ে কম মুনাফা পাওয়া।
- মেয়াদ শেষে আবার কিনলে আগের হারই পাওয়া যাবে ভাবা। পুনঃবিনিয়োগ নতুন কেনা, তাই নতুন হার।
- প্রতিটি স্কিমের সীমা আলাদা আলাদা যোগ করে ভাবা যে সব মিলিয়ে অনেক বেশি কেনা যাবে। মোট সীমাও আছে।
স্কিম মানে মেয়াদ আর মুনাফা পাওয়ার ছক: আগে ঠিক করুন টাকা কত দিন রাখতে পারবেন আর মুনাফা কখন দরকার, তারপর হারের পুরো তালিকাটা দেখুন, শুধু মেয়াদপূর্তির হার নয়।