BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়)

বিদেশে কাজ করা মানুষ দেশে পরিবারের কাছে যে টাকা পাঠান। একেকটা পরিবারের সংসার চালানো এই টাকা একসঙ্গে দেশের ডলারের সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটা।

ভিডিও আসছে
প্রবাসীর পাঠানো টাকা কীভাবে পুরো দেশের অর্থনীতি চালায়

রেমিট্যান্স কী

রেমিট্যান্স মানে বিদেশে থাকা বা কাজ করা মানুষ দেশে যে টাকা পাঠান। সৌদি আরবের নির্মাণশ্রমিক, মালয়েশিয়ার কারখানাকর্মী, যুক্তরাজ্যের রেস্টুরেন্ট মালিক বা যুক্তরাষ্ট্রের চাকরিজীবী, সবাই নিজের আয়ের একটা অংশ পাঠান মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান বা ভাইবোনের কাছে। বিদেশি মুদ্রায় আসা এই টাকা দেশে পৌঁছে টাকায় রূপান্তরিত হয়।

পরিবারের জন্য এটা সংসার খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বাড়ি বানানো বা জমি কেনার টাকা। দেশের জন্য এটা ডলারের জোগান, যা দিয়ে আমদানির দাম মেটানো আর বিদেশি ঋণ শোধ করা হয়। তাই রেমিট্যান্সকে একসঙ্গে পারিবারিক আয় আর জাতীয় বৈদেশিক আয় দুটোই বলা যায়।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক কুমিল্লার কামাল দুবাইয়ে কাজ করেন আর প্রতি মাসে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বাড়িতে টাকা পাঠান। তাঁর পাঠানো ডলার দেশের ব্যাংকে ঢুকে টাকায় বদলায়, আর তাঁর মা গ্রামের দোকানে সেই টাকায় চাল, তেল, ওষুধ কেনেন। ডলারটা যায় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায়, যা দিয়ে হয়তো কোনো আমদানিকারক জ্বালানি তেল আনেন। একটা পাঠানো টাকা এভাবে একসঙ্গে একটা পরিবার আর পুরো দেশের কাজে লাগে।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • টাকার মান আর রিজার্ভে প্রভাব: রেমিট্যান্স বাড়লে দেশে ডলারের জোগান বাড়ে, রিজার্ভ শক্ত হয় আর টাকার ওপর চাপ কমে। তার প্রভাব পড়ে ইনফ্লেশন আর সুদের হারেও।
  • ভোগ আর ব্যবসায় প্রভাব: গ্রামগঞ্জে খরচের বড় অংশ রেমিট্যান্সনির্ভর। তাই নিত্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী বা ব্যাংকিং খাতের ব্যবসাও রেমিট্যান্সের ওঠানামায় প্রভাবিত হয়।
  • প্রবাসী পরিবারের নিজের পরিকল্পনা: নিয়মিত রেমিট্যান্স কোথায় রাখা হবে, কতটা খরচ আর কতটা সঞ্চয়, সেই সিদ্ধান্ত পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঠিক করে। প্রবাসীদের জন্য আলাদা সরকারি বন্ডও আছে।
  • ঝুঁকি বোঝা: রেমিট্যান্স নির্ভর করে বিদেশের চাকরির বাজার, তেলের দাম আর সেসব দেশের নিয়মের ওপর। পরিবারের আয় একটা উৎসে আটকে থাকলে সেটাও একধরনের কনসেনট্রেশন রিস্ক।

বাংলাদেশে রেমিট্যান্স কত বড়

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড প্রায় ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার, মানে এক বছরে প্রায় ১৭% বেশি। তুলনার জন্য, একই বছরে পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতির আকারের তুলনায়, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেমিট্যান্স ছিল জিডিপির মোটামুটি ৪.৬% থেকে ৬.১%-এর মধ্যে, আর ২০২৫ সালে প্রায় ৭.৪%। সংখ্যাগুলো প্রতি বছর বদলায়; সর্বশেষ মাসিক হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ করে।

কোথা থেকে আসে

ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এই পাঁচ দেশ মিলে মোটের প্রায় ৬২%। ক্রম বছরে বছরে বদলায়।

  • মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স অনেকটা নির্ভর করে তেলের দাম আর সেখানকার নির্মাণ ও সেবা খাতের চাহিদার ওপর।

বৈধ চ্যানেল কেন জরুরি

  • ব্যাংক বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঠানো ডলার দেশের রিজার্ভে যোগ হয়। হুন্ডির মতো অবৈধ পথে টাকা পরিবারের কাছে পৌঁছালেও ডলারটা দেশে আসে না।
  • হুন্ডি বেআইনি, আর এতে প্রতারণার ঝুঁকি আছে, টাকা আটকে গেলে অভিযোগ করার জায়গাও থাকে না।
  • বৈধ চ্যানেলে পাঠাতে উৎসাহ দিতে সরকার নগদ প্রণোদনা দিয়ে আসছে। হার ও শর্ত সরকার ঠিক করে, আর সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে।

হাতে-কলমে হিসাব

একই ডলার, ভিন্ন টাকা (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)
  1. ধরা যাক কামাল প্রতি মাসে ৫০০ ডলার পাঠান। ডলারের রেট ১১০ টাকা হলে পরিবার পায় ৫৫,০০০ টাকা, বছরে ৬,৬০,০০০ টাকা।
  2. রেট ১২২ টাকা হলে একই ৫০০ ডলারে পায় ৬১,০০০ টাকা, বছরে ৭,৩২,০০০ টাকা। টাকার অঙ্কে বছরে ৭২,০০০ টাকা বেশি।
  3. কিন্তু টাকা যখন দুর্বল হয়, তখন সাধারণত দামও বাড়ে। ধরা যাক একই সময়ে পরিবারের খরচ ১০% বেড়েছে: আগের ৬,৬০,০০০ টাকার খরচ এখন ৭,২৬,০০০ টাকা।

ফল: টাকার অঙ্ক প্রায় ১১% বাড়লেও কেনার ক্ষমতা বেড়েছে মাত্র সামান্য। রেটের লাভকে পুরোটা বাড়তি আয় না ভেবে ইনফ্লেশন বাদ দিয়ে হিসাব করা দরকার। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • রেট বেশি পাওয়ার আশায় হুন্ডির মতো অবৈধ পথে টাকা পাঠানো। এটা বেআইনি, ঝুঁকিপূর্ণ, আর দেশের রিজার্ভেও যোগ হয় না।
  • প্রতি মাসের রেমিট্যান্স পুরোটা খরচ করে ফেলা, এই ভেবে যে বিদেশের আয় সবসময় চলবে। চাকরি, ভিসা বা স্বাস্থ্য বদলালে আয় হঠাৎ থেমে যেতে পারে।
  • ভালো করে না বুঝে আত্মীয়-পরিচিতের কথায় রেমিট্যান্সের টাকা কোথাও ঢেলে দেওয়া। দূর থেকে তদারকি কঠিন, তাই ঝুঁকিও বেশি।
  • শুধু টাকার অঙ্ক দেখে ভাবা "আয় বেড়েছে", ইনফ্লেশন বাদ না দিয়ে।
মনে রাখুন

রেমিট্যান্স একসঙ্গে পরিবারের আয় আর দেশের ডলারের বড় উৎস; বৈধ চ্যানেলে পাঠানো টাকাই দেশের রিজার্ভে যোগ হয়, আর পরিবারের হিসাবে রেটের লাভ মাপুন ইনফ্লেশন বাদ দিয়ে।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩০.৩৩ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশ ব্যাংক): প্রথম আলো ইংলিশ, "Bangladesh receives record $35.56b in remittances in FY2025-26", ১ জুলাই ২০২৬ ↗
রেমিট্যান্স জিডিপির শতাংশ হিসেবে, ২০১৫–২০২৫: বিশ্বব্যাংক, Personal remittances, received (% of GDP), দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
শীর্ষ পাঁচ উৎস দেশ ও তাদের প্রায় ৬২% ভাগ, নগদ প্রণোদনা ও হুন্ডির বিরুদ্ধে তদারকি: ঢাকা ট্রিবিউন, "FY26: 62% remittances came from just 5 countries", ৯ আগস্ট ২০২৬ ↗
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, "Trade deficit widens 24pc in FY26", ২৪ জুলাই ২০২৬ ↗
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।