সার্কিট ব্রেকার কী
বাসার ইলেকট্রিক লাইনে বেশি লোড হলে সার্কিট ব্রেকার "ট্রিপ" করে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়, যাতে আগুন না লাগে। শেয়ারবাজারের সার্কিট ব্রেকারও তেমন: আগের দিনের দামের তুলনায় এক দিনে শেয়ারের দাম একটা নির্দিষ্ট শতাংশের বেশি উঠতে বা নামতে দেওয়া হয় না। ওপরের সীমাকে বলে আপার সার্কিট, নিচেরটাকে লোয়ার সার্কিট।
সীমায় পৌঁছালে লেনদেন পুরো বন্ধ হয় না; শুধু ওই সীমার বাইরে কোনো দামে লেনদেন হয় না। ধরা যাক দাম লোয়ার সার্কিটে আটকে গেল। বিক্রেতারা সারি দিয়ে আছেন, কিন্তু ওই দামে ক্রেতা কম। তখন অনেকে বেচতেই পারেন না, আর পরের দিন নতুন সীমা নিয়ে আবার শুরু হয়।
ধরা যাক একটা শেয়ার গতকাল ১০০ টাকায় শেষ হয়েছে, আর সীমা ১০%। আজ এর দাম ৯০ টাকার নিচে বা ১১০ টাকার ওপরে যেতে পারবে না। সকালে খবর ছড়াল যে কোম্পানির কারখানায় আগুন লেগেছে। সবাই বেচতে চাইছেন, দাম দ্রুত ৯০ টাকায় নেমে আটকে গেল। কেউ ৮০ টাকায় বেচতে রাজি থাকলেও আজ তা সম্ভব নয়। আতঙ্কের মধ্যে অন্তত একটা রাত সবাই খবরটা যাচাই করার সময় পেলেন। ঘটনা ও সংখ্যা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- লোয়ার সার্কিটে বেচা কঠিন: দাম সীমায় আটকে গেলে বিক্রেতার সারি লম্বা হয়, ক্রেতা কম থাকে। দরকারের দিনে টাকা তোলা না-ও যেতে পারে।
- আপার সার্কিটও সতর্কসংকেত হতে পারে: পরপর কয়েক দিন আপার সার্কিট মানে চাহিদা বেশি, কিন্তু সেটা ভালো খবর না গুজব, তা আলাদা প্রশ্ন।
- সীমা দিনে দিনে জমে: প্রতিদিনের সীমা ছোট মনে হলেও কয়েক দিনে দাম অনেক দূর যেতে পারে।
- নিয়ম বদলায়: সংকটের সময় নিয়ন্ত্রক বা এক্সচেঞ্জ সীমা বদলাতে পারে, তাই কেনার আগে চালু নিয়মটা জানা দরকার।
বাংলাদেশে দামের ধাপে ধাপে সীমা
বাংলাদেশে সার্কিট ব্রেকার শেয়ারের দামের ওপর নির্ভর করে: দাম যত বেশি, শতাংশের সীমা তত কম। জুন ২০২১-এ বিএসইসির আদেশে যে সাধারণ কাঠামো ঠিক হয়েছিল, তা নিচে দেওয়া হলো। তখন বলা হয়েছিল, নতুন তালিকাভুক্ত শেয়ারও লেনদেনের প্রথম দিন থেকে একই নিয়মে চলবে।
জুলাই ২০২৬-এ বিএসইসি তার ২০২১ সালের নির্দেশনা প্রত্যাহার করে সার্কিট ব্রেকারসহ বাজার নিয়ন্ত্রণের মাপকাঠি ঠিক করার ক্ষমতা ডিএসই আর সিএসইকে দিয়েছে। তাই সামনে সীমা বদলাতে পারে, বা দুই এক্সচেঞ্জে আলাদা হতে পারে। সর্বশেষ সীমা এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে দেখে নিন।
- ২০০ টাকা পর্যন্ত দামের শেয়ার: দিনে ১০%
- ২০০–৫০০ টাকা: ৮.৭৫%
- ৫০১–১,০০০ টাকা: ৭.৫%
- ১,০০১–২,০০০ টাকা: ৬.২৫%
- ২,০০১–৫,০০০ টাকা: ৫%
- ৫,০০০ টাকার বেশি: ৩.৭৫%
সংকটে সীমা বদলালে কী হয়েছে
দাম পড়তে থাকলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কয়েকবার নিচের সীমা ছোট করেছে, বা আরও কড়া ব্যবস্থা হিসেবে ফ্লোর প্রাইস (দামের নিচের দেয়াল) বসিয়েছে। যেমন ২৪ এপ্রিল ২০২৪-এ বিএসইসি নিচের সীমা ১০% থেকে কমিয়ে ৩% করে, যাতে আতঙ্কের বিক্রি থামে।
পরের দিনই বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ পড়তি শেয়ার ৩% সীমায় নেমে যায়; ইনভেস্টররা বলেন, বেচা আর কেনা দুটোই কঠিন হয়ে পড়েছিল। আগস্ট ২০২৪-এ নিচের সীমা আবার ১০% করা হয়। শিক্ষাটা হলো: সীমা পতনের গতি কমাতে পারে, কিন্তু বিক্রেতা বেশি থাকলে পতন কয়েক দিনে ছড়িয়ে যায় মাত্র, আর মাঝখানে লেনদেন আটকে থাকে।
অন্য দেশের বাজারে
অনেক দেশে পুরো বাজারের জন্যও সার্কিট ব্রেকার আছে। যেমন আমেরিকায় এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৭% বা ১৩% পড়লে (বিকেল ৩:২৫-এর আগে) পুরো বাজারে ১৫ মিনিট লেনদেন থেমে থাকে, আর ২০% পড়লে সেদিনের মতো লেনদেন বন্ধ। সেখানে আলাদা শেয়ারের জন্যও ছোট ছোট বিরতির নিয়ম আছে, দিনভর একটা নির্দিষ্ট সীমার বদলে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক জুন ২০২১-এর কাঠামো চালু। ১০০ টাকার শেয়ারে সীমা ১০%: আজ দাম থাকবে ৯০ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে।
- ৩০০ টাকার শেয়ারে সীমা ৮.৭৫%, মানে ২৬.২৫ টাকা: আজ দাম থাকবে ২৭৩.৭৫ থেকে ৩২৬.২৫ টাকার মধ্যে।
- ১০০ টাকার শেয়ারটা পরপর তিন দিন আপার সার্কিটে উঠলে: ১১০, তারপর ১২১, তারপর ১৩৩.১০ টাকা। প্রতিদিন সীমা হিসাব হয় আগের দিনের দাম থেকে।
ফল: দিনে ১০% সীমা থাকলেও তিন দিনে দাম প্রায় ৩৩% বাড়তে পারে, একইভাবে তিন দিনে প্রায় ২৭% কমতেও পারে (১০০ থেকে ৭২.৯০)। সার্কিট ব্রেকার গতি কমায়, গন্তব্য বদলায় না। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "সার্কিট ব্রেকার আছে, তাই বেশি লোকসান হবে না" ভাবা। সীমা প্রতিদিন নতুন করে শুরু হয়, কয়েক দিনে বড় পতন সম্ভব।
- লোয়ার সার্কিটের দামে যেকোনো সময় বেচা যাবে ধরে নেওয়া। ওই দামে ক্রেতা না থাকলে বেচাই যায় না।
- আপার সার্কিট দেখেই "নিশ্চয়ই ভালো কিছু হচ্ছে" ভেবে পেছনে দৌড়ানো। কারণটা যাচাই না করে কেনা বড় ঝুঁকি।
- পুরোনো নিয়ম মনে রেখে চলা। সীমা সময়ে সময়ে বদলায়, এখন এক্সচেঞ্জও তা বদলাতে পারে।
সার্কিট ব্রেকার দামের গতি কমায়, ঝুঁকি মুছে দেয় না: সীমায় আটকে গেলে বেচা-কেনা দুটোই কঠিন হতে পারে, আর কয়েক দিনে দাম অনেক দূর যেতে পারে।