ইনট্রিনসিক ভ্যালু কী
ইনট্রিনসিক ভ্যালু মানে একটা ব্যবসা বা শেয়ারের "আসল" মূল্য, যা আজকের বাজারদর থেকে আলাদা। ওয়ারেন বাফেটের সংজ্ঞায়, এটা হলো একটা ব্যবসার বাকি জীবনে তা থেকে যত নগদ টাকা বের করে আনা যাবে, তার ডিসকাউন্ট করা মূল্য। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের টাকাকে আজকের টাকায় রূপান্তর করে যোগ করা।
বাফেট নিজেই মনে করিয়ে দেন, এটা নিখুঁত সংখ্যা নয়, একটা আন্দাজ। সুদের হার বদলালে বা ভবিষ্যতের আয়ের পূর্বাভাস বদলালে আন্দাজও বদলাতে হয়। একই তথ্য দেখে দুজন মানুষ, এমনকি তিনি আর তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী চার্লি মাঙ্গারও, প্রায় নিশ্চিতভাবেই কিছুটা আলাদা সংখ্যায় পৌঁছান।
ধরা যাক আপনি একটা সিএনজি অটোরিকশা কিনে ভাড়ায় দিতে চান। এর আসল মূল্য নির্ভর করে, কয়েক বছর ধরে খরচ বাদে প্রতি মাসে কত ভাড়া আসবে আর শেষে কত দামে বেচা যাবে, তার ওপর। কেউ বাজারে চিৎকার করে বেশি দাম হাঁকলে, বা ভয়ে কম দামে ছেড়ে দিলে, গাড়িটা থেকে আসা টাকার পরিমাণ বদলায় না। দাম আর মূল্যের এই পার্থক্যটাই ইনট্রিনসিক ভ্যালুর মূল কথা। উদাহরণটি কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- দাম কম না বেশি, বোঝার মাপকাঠি পেতে: মূল্যের একটা আন্দাজ না থাকলে "সস্তা" বা "দামি" কথার কোনো ভিত্তি থাকে না।
- মার্জিন অব সেফটির জন্য: মূল্য আর দামের ফাঁক মাপতে আগে মূল্যটা জানা দরকার।
- গুজব আর হুজুগ থেকে দূরে থাকতে: দাম কেন উঠছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো ব্যবসাটা কী দিচ্ছে।
- সুদের হার বদলালে শেয়ারের দাম কেন নড়ে, তা বুঝতে।
তিনটি আলাদা "মূল্য"
- বাজারদর: আজ স্টক এক্সচেঞ্জে যে দামে শেয়ার কেনাবেচা হচ্ছে। এটা প্রতিদিন, প্রতি মিনিটে বদলায়, আর মানুষের আশা-ভয়ে ওঠানামা করে।
- বুক ভ্যালু: ব্যালান্স শিটে সম্পদ থেকে দেনা বাদ দিলে যা থাকে। এটা অতীতের হিসাবের ওপর দাঁড়ানো, ভবিষ্যতের আয়ের কথা বলে না।
- ইনট্রিনসিক ভ্যালু: ভবিষ্যতে ব্যবসাটা কত টাকা দেবে, তার আন্দাজ থেকে বের করা মূল্য। এটা কোথাও ছাপা থাকে না; নিজেকে হিসাব করে বের করতে হয়।
কীভাবে আন্দাজ করা হয়
মোটা দাগে তিন রকম পদ্ধতি আছে। সম্পদভিত্তিক: কোম্পানির নিট সম্পদ আসলে কত দামি। আয়ভিত্তিক: টেকসই মুনাফা কত, আর তার জন্য কত দেওয়া যুক্তিসঙ্গত। নগদ প্রবাহভিত্তিক: ভবিষ্যতের নগদ টাকাকে আজকের মূল্যে আনা, যাকে বলে ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (ডিসিএফ)। সিএফএ ইনস্টিটিউটও ইনট্রিনসিক ভ্যালুকে ভবিষ্যতের প্রত্যাশিত নগদ প্রবাহের বর্তমান মূল্য হিসেবেই ব্যাখ্যা করে।
বাংলাদেশে পাবলিক ইস্যু রুলস ২০১৫ অনুযায়ী আইপিও-র দাম ঠিক করতে ইস্যু ম্যানেজারদের কয়েকটি পদ্ধতি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে: নিট সম্পদ মূল্য, আগের পাঁচ বছরের করপরবর্তী মুনাফার ভারিত গড়ভিত্তিক মূল্য, আর একই রকম শেয়ারের গড় বাজারদর (২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী; নিয়ম বদলাতে পারে)। পেশাদাররাও যে মূল্য একাধিক দিক থেকে দেখেন, আর পদ্ধতিভেদে উত্তর আলাদা হতে পারে, এটা তারই উদাহরণ।
মূল্য কী কারণে বদলায়
- ভবিষ্যতের আয়ের আন্দাজ: নতুন কারখানা, প্রতিযোগী, কাঁচামালের দাম, এসব বদলালে মূল্যও বদলায়।
- সুদের হার: এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রে বেশি পাওয়া গেলে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত আয়ের জন্য মানুষ কম দিতে চায়, তাই মূল্য কমে।
- রিস্ক আর টেকসইতা: আয় যত অনিশ্চিত, আর প্রতিযোগিতায় সুরক্ষা যত কম, মূল্য তত কম।
- যা বদলায় না: শুধু গতকাল শেয়ারের দাম পড়েছে বা বেড়েছে বলে ব্যবসার মূল্য বদলায় না।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক "রূপসা ফুডস লিমিটেড" নামের একটা কাল্পনিক কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ (বুক ভ্যালু) ৪০ টাকা। সম্পদভিত্তিক আন্দাজ: প্রায় ৪০ টাকা।
- কোম্পানির টেকসই মুনাফা শেয়ারপ্রতি ৬ টাকা, আর আপনি এমন রিস্কের জন্য বছরে ১২% রিটার্ন চান। মুনাফা না বেড়ে এমনই থাকলে: ৬ ÷ ০.১২ = ৫০ টাকা।
- একটু আশাবাদী হলে, ধরুন টেকসই মুনাফা ৭ টাকা: ৭ ÷ ০.১২ ≈ ৫৮ টাকা।
ফল: আপনার আন্দাজে মূল্য মোটামুটি ৪০ থেকে ৫৮ টাকার মধ্যে, একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়। বাজারদর এই পরিসরের কোথায় আছে, সেটা আলাদা প্রশ্ন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- নিজের আন্দাজকে একটা নিখুঁত সংখ্যা ভাবা। মূল্য একটা পরিসর।
- বুক ভ্যালু, আইপিও-র দাম বা আগের সর্বোচ্চ দামকে আসল মূল্য ধরে নেওয়া।
- প্রতিদিনের দামের ওঠানামা দেখে মূল্যের আন্দাজ বারবার বদলানো।
- অন্য কারও "টার্গেট প্রাইস" তার পেছনের অনুমানগুলো না জেনে মেনে নেওয়া।
বাজারদর বলে মানুষ আজ কত দিচ্ছে; ইনট্রিনসিক ভ্যালু বলে ব্যবসাটা ভবিষ্যতে কত দেবে। দ্বিতীয়টা নিজে আন্দাজ করুন, একটা পরিসর হিসেবে।