ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট কী
ইনকাম স্টেটমেন্ট বলে কোম্পানি কত লাভ করল; ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট বলে কত নগদ টাকা আসলে হাতে এল আর গেল। দুটো এক নয়, কারণ হিসাবের নিয়মে বাকিতে বিক্রিও আয় হিসেবে ধরা হয়, আর যন্ত্রপাতির ডেপ্রিসিয়েশন খরচ হিসেবে ধরা হয় যদিও সে বছর কোনো টাকা বের হয়নি।
নগদ টাকা প্রবাহকে তিন ভাগে দেখানো হয়: অপারেটিং (মূল ব্যবসা চালিয়ে), ইনভেস্টিং (কারখানা, যন্ত্রপাতি বা অন্য ইনভেস্টমেন্ট কেনা-বেচা), আর ফাইন্যান্সিং (লোন নেওয়া বা শোধ, নতুন শেয়ার ছাড়া, ডিভিডেন্ড দেওয়া)। তিনটার যোগফলই বছরে নগদ কতটা বাড়ল বা কমল।
ধরা যাক নাসরিনের পোশাকের অনলাইন দোকান এক মাসে ১,০০,০০০ টাকার জামা বিক্রি করল, খরচ বাদে লাভ ২০,০০০ টাকা। কিন্তু অর্ধেক বিক্রি ক্যাশ অন ডেলিভারিতে, কুরিয়ারের কাছ থেকে টাকা এখনও আসেনি। খাতায় লাভ ২০,০০০, অথচ মাস শেষে কাপড়ের দোকানের বিল দেওয়ার মতো নগদ তাঁর হাতে নেই। লাভ আর নগদের এই ফাঁকটাই ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট ধরে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- লাভের মান যাচাই করতে: বছরের পর বছর লাভ দেখাচ্ছে অথচ অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো কম বা নেগেটিভ, এমন কোম্পানির লাভ নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত।
- ডিভিডেন্ড কোথা থেকে আসছে বুঝতে: ব্যবসার নগদ আয় থেকে, নাকি নতুন লোন নিয়ে।
- কোম্পানি টিকে থাকার ক্ষমতা বুঝতে: লাভজনক কোম্পানিও নগদ ফুরিয়ে গেলে বেতন বা কিস্তি দিতে না পেরে বিপদে পড়তে পারে।
- বাংলাদেশে কোম্পানিগুলো প্রতিটি কোয়ার্টারে ইপিএসের পাশে এনওসিএফপিএস (শেয়ারপ্রতি নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো) প্রকাশ করে। দুটো পাশাপাশি রাখলেই প্রথম সংকেত পাওয়া যায়।
তিনটা অংশ কী বলে
- অপারেটিং: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুস্থ ব্যবসায় এটা সাধারণত পজিটিভ, আর দীর্ঘ সময়ে মোটামুটি নিট প্রফিটের কাছাকাছি বা বেশি থাকে।
- ইনভেস্টিং: বাড়তে থাকা কোম্পানিতে এটা সাধারণত নেগেটিভ, কারণ তারা কারখানা আর যন্ত্রে টাকা ঢালছে। পজিটিভ হলে দেখুন, কোম্পানি কি সম্পদ বিক্রি করে টাকা তুলছে?
- ফাইন্যান্সিং: লোন নিলে বা শেয়ার ছাড়লে পজিটিভ, লোন শোধ বা ডিভিডেন্ড দিলে নেগেটিভ। বছরের পর বছর বড় পজিটিভ মানে কোম্পানি বাইরের টাকার ওপর নির্ভর করছে।
লাভ থেকে নগদে: কেন অঙ্ক মেলে না
বেশিরভাগ কোম্পানি "ইনডিরেক্ট" পদ্ধতিতে অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো দেখায়: নিট প্রফিট থেকে শুরু করে নগদ-বিহীন খরচ (যেমন ডেপ্রিসিয়েশন) যোগ করে, আর ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের পরিবর্তন সমন্বয় করে। ক্রেতার কাছে পাওনা বা মজুত বাড়লে নগদ আটকে যায়, তাই বাদ যায়; সরবরাহকারীর কাছে দেনা বাড়লে নগদ কম বের হয়, তাই যোগ হয়।
ফ্রি ক্যাশ ফ্লো একটা জনপ্রিয় হিসাব: অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো থেকে যন্ত্রপাতি ও কারখানায় খরচ (ক্যাপেক্স) বাদ দিলে যা থাকে। এটা মোটামুটি সেই টাকা যা দিয়ে লোন শোধ বা ডিভিডেন্ড দেওয়া যায় ব্যবসা না কমিয়ে। বড় সম্প্রসারণের বছরে এটা নেগেটিভ হওয়া স্বাভাবিক হতে পারে; চিন্তার বিষয় হলো বহু বছর ধরে নেগেটিভ থাকা।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক কাল্পনিক "রূপসা ফুডস লিমিটেড"-এর নিট প্রফিট ৪৫ কোটি টাকা। ডেপ্রিসিয়েশন ৩০ কোটি যোগ (টাকা বের হয়নি): ৭৫ কোটি।
- ক্রেতার কাছে পাওনা বাড়ল ১৫ কোটি আর মজুত বাড়ল ১০ কোটি (বাদ), সরবরাহকারীর দেনা বাড়ল ৫ কোটি (যোগ)। অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো = ৭৫ − ১৫ − ১০ + ৫ = ৫৫ কোটি। শেয়ার ১০ কোটিটি, তাই এনওসিএফপিএস ৫.৫০ টাকা।
- নতুন যন্ত্র কেনা হলো ৬০ কোটির (ইনভেস্টিং −৬০)। নতুন লোন ২০ কোটি এল, ডিভিডেন্ড গেল ২০ কোটি (ফাইন্যান্সিং ০)।
ফল: বছরে নগদ কমল ৫ কোটি (৫৫ − ৬০ + ০)। ফ্রি ক্যাশ ফ্লো −৫ কোটি, অর্থাৎ এ বছরের ডিভিডেন্ড আসলে নতুন লোনের টাকায় দেওয়া হয়েছে। এক বছরে সেটা সমস্যা না-ও হতে পারে; বহু বছর চললে প্রশ্ন ওঠে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু ইপিএস দেখা, এনওসিএফপিএস বা অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো না দেখা।
- বছর শেষে নগদ বেড়েছে দেখেই খুশি হওয়া, অথচ বাড়তি টাকাটা এসেছে নতুন লোন থেকে।
- ইনভেস্টিং অংশ নেগেটিভ দেখে খারাপ ভাবা। বাড়তে থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে এটা প্রায়ই স্বাভাবিক।
- এক বছরের ক্যাশ ফ্লো দিয়ে বিচার করা। বড় কেনাকাটা বা মৌসুমি মজুতের কারণে এক বছর অস্বাভাবিক হতে পারে; কয়েক বছরের যোগফল বেশি নির্ভরযোগ্য।
লাভ একটা মত, নগদ একটা সত্য: কোম্পানির লাভ বছরের পর বছর নগদে রূপ নিচ্ছে কি না, সেটা দেখুন।