ট্যাক্স ও সরকারি খরচ কী
সরকার চালাতে টাকা লাগে: শিক্ষক-ডাক্তার-পুলিশের বেতন, রাস্তা-সেতু, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও খাদ্যে ভর্তুকি, আর আগের ঋণের সুদ। এই টাকার বড় অংশ আসে ট্যাক্স থেকে। ট্যাক্স দুই ধরনের। ডিরেক্ট ট্যাক্স সরাসরি আয় বা সম্পদের ওপর বসে, যেমন ইনকাম ট্যাক্স। ইনডিরেক্ট ট্যাক্স বসে কেনাকাটার ওপর, যেমন ভ্যাট আর আমদানি শুল্ক, যা দামের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।
আয় আর খরচ মিলিয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেয়, কত ট্যাক্স নেবে, কোথায় কত খরচ করবে, তাকে বলে ফিসকাল পলিসি। এর প্রধান দলিল হলো প্রতি বছরের বাজেট। খরচ আয়ের চেয়ে বেশি হলে যে ঘাটতি থাকে, সরকার তা ধার করে মেটায়।
ধরা যাক রাফি একজন ছাত্র, কোনো আয় নেই, তাই ইনকাম ট্যাক্স রিটার্নও দেন না। তবু তিনি ট্যাক্স দেন। মোবাইল রিচার্জ, রেস্টুরেন্টের বিল, দোকান থেকে কেনা শ্যাম্পু, অনেক কিছুর দামের মধ্যেই ভ্যাট বা শুল্ক ধরা থাকে। আর তাঁর ভার্সিটির ভর্তুকি, বাসের রাস্তা, রাতের রাস্তার আলো, এগুলো সেই ট্যাক্সের টাকাতেই চলে। দেশের প্রায় প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে ট্যাক্স দেন আর সরকারি খরচের সুবিধা পান।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- আপনার রিটার্নে সরাসরি প্রভাব: সুদ, ডিভিডেন্ড, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা, শেয়ারের ক্যাপিটাল গেইন, সবকিছুর ওপর ট্যাক্সের নিয়ম বাজেটের সঙ্গে বদলাতে পারে। করের পরে কত থাকে, সেটাই আসল হিসাব।
- সুদের হারে প্রভাব: সরকারের ঘাটতি বেশি হলে ধার বেশি লাগে। ব্যাংক থেকে বেশি ধার নিলে ট্রেজারি বিল-বন্ডের ইল্ড আর সাধারণ সুদের হার বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
- কোম্পানির ব্যবসায় প্রভাব: সরকার কোথায় খরচ বাড়ায় বা কোন পণ্যে শুল্ক-ভ্যাট বদলায়, তাতে বিভিন্ন খাতের বিক্রি ও লাভ বাড়ে-কমে। বাজেটের দিন শেয়ারবাজার তাই মনোযোগ দিয়ে দেখে।
- দামে প্রভাব: ভ্যাট বা আমদানি শুল্ক বদলালে দোকানের দাম বদলায়, তাই ইনফ্লেশনেও এর ছাপ পড়ে।
সরকারের আয় কোথা থেকে
বাংলাদেশে সরকারের বেশিরভাগ ট্যাক্স তোলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআর তুলেছিল প্রায় ৩.৭০ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট প্রায় ১.৪১ লাখ কোটি, ইনকাম ট্যাক্স প্রায় ১.২৯ লাখ কোটি আর আমদানি-রপ্তানি শুল্ক প্রায় ১.০০ লাখ কোটি টাকা। মানে মোটামুটি তিন ভাগের এক ভাগ করে।
দেশের মোট আয়ের তুলনায় সরকার কত ট্যাক্স তোলে, তা মাপা হয় ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দিয়ে। আইএমএফের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ট্যাক্স রাজস্ব ছিল জিডিপির প্রায় ৬.৯%। এটা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও নিচের দিকে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কম ট্যাক্স-জিডিপি মানে খরচের জন্য সরকারকে ধারের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
সরকারের খরচ কোথায় যায়
বাজেটের খরচকে মোটা দাগে দুই ভাগে দেখা হয়। পরিচালন খরচ হলো প্রতি বছরের চলতি খরচ: বেতন-পেনশন, ভর্তুকি, অফিস চালানো আর ঋণের সুদ। উন্নয়ন খরচ, যার বড় অংশ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), যায় রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্কুল-হাসপাতালের মতো প্রকল্পে, যা ভবিষ্যতের উৎপাদন বাড়াতে পারে।
একটা বড় খরচ আলাদা করে দেখার মতো: সুদ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সুদ পরিশোধে রাখা হয়েছিল প্রায় ১.২৭ লাখ কোটি টাকা, যেখানে মোট বাজেট প্রায় ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা। সংখ্যাগুলো প্রতি বছর বদলায়; সর্বশেষ হিসাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট দলিলে থাকে।
ফিসকাল পলিসি কীভাবে কাজ করে
- খরচ বাড়ানো বা ট্যাক্স কমানো (সম্প্রসারণমূলক): মানুষের হাতে ও বাজারে টাকা বাড়ে, চাহিদা ও কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। তবে ঘাটতি আর ধার বাড়ে, আর অর্থনীতি আগেই গরম থাকলে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
- খরচ কমানো বা ট্যাক্স বাড়ানো (সংকোচনমূলক): ঘাটতি কমে, দামের চাপ কমতে পারে, কিন্তু চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হতে পারে।
- কতটা প্রভাব পড়ে, সেটা নির্ভর করে টাকা কোথায় খরচ হলো, অর্থনীতি তখন কোন অবস্থায়, আর ধার কোথা থেকে এলো তার ওপর। এর মাত্রা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে।
হাতে-কলমে হিসাব
- মোট বাজেট প্রায় ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা। মোট রাজস্ব লক্ষ্য প্রায় ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা। ৬.৯৫ ÷ ৯.৩৮ ≈ ০.৭৪। মানে প্রতি ১০০ টাকা খরচের প্রায় ৭৪ টাকা আসার কথা রাজস্ব থেকে।
- এর মধ্যে এনবিআরের ট্যাক্স লক্ষ্য প্রায় ৬.০৪ লাখ কোটি টাকা: ৬.০৪ ÷ ৯.৩৮ ≈ ০.৬৪, মানে প্রায় ৬৪ টাকা। বাকি প্রায় ২৬ টাকা (ঘাটতি প্রায় ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা) আসবে ধার থেকে।
- খরচের দিকে, সুদ বাবদ প্রায় ১.২৭ লাখ কোটি টাকা: ১.২৭ ÷ ৯.৩৮ ≈ ০.১৩৫। মানে প্রতি ১০০ টাকা খরচের প্রায় ১৩.৫ টাকা যায় শুধু আগের ঋণের সুদে।
ফল: বাজেটের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ আসে রাজস্ব থেকে, এক ভাগ ধার থেকে, আর খরচের একটা বড় অংশ যায় সুদে। এগুলো প্রস্তাবিত লক্ষ্য; আসল আদায় ও খরচ বছর শেষে ভিন্ন হতে পারে।
সূত্র: ইউএনবি, ১১ জুন ২০২৬
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| এনবিআরের কর | অন্যান্য রাজস্ব | ধার | |
|---|---|---|---|
| প্রতি ১০০ টাকা | ৬৪ | ১০ | ২৬ |
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "আমি রিটার্ন দিই না, তাই ট্যাক্সও দিই না" ভাবা। ভ্যাট আর শুল্কের মাধ্যমে প্রায় সবাই ট্যাক্স দেন।
- বাজেটের লক্ষ্যকে আসল আদায় ধরে নেওয়া। রাজস্ব আদায় প্রায়ই লক্ষ্যের চেয়ে কম হয়।
- বাজেটের মোট টাকার অঙ্ক দেখে বিচার করা। বড় অঙ্কের চেয়ে জরুরি হলো জিডিপির তুলনায় কত, আর টাকা কোথায় যাচ্ছে।
- বাজেটের দিন একটা ট্যাক্স পরিবর্তনের খবর শুনেই তাড়াহুড়ো করে ইনভেস্টমেন্ট বদলে ফেলা, পুরো নিয়ম আর তা কবে থেকে কার্যকর না জেনে।
সরকারের আয় আসে মূলত ভ্যাট, ইনকাম ট্যাক্স আর শুল্ক থেকে; আয় খরচের চেয়ে কম হলে ধার বাড়ে, আর সেই ধার সুদের হার ও আপনার রিটার্নে প্রভাব ফেলে।