সাপোর্ট আর রেজিস্ট্যান্স কী
সাপোর্ট হলো এমন একটা দামের এলাকা, যেখানে অতীতে দাম নামতে নামতে থেমে গেছে, কারণ ওই দামে কেনার আগ্রহ এত বেশি ছিল যে পতন আটকে গেছে। রেজিস্ট্যান্স ঠিক উল্টো: যেখানে দাম উঠতে উঠতে থেমেছে, কারণ ওই দামে বেচার চাপ বেশি ছিল।
বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবুন। ইলিশের দাম কমতে কমতে একটা জায়গায় এলে অনেক ক্রেতা একসঙ্গে কিনতে আসেন, তখন দাম আর নামে না। আবার দাম একটা সীমা ছাড়ালে অনেকে কেনা বন্ধ করেন, আর বিক্রেতারা তাড়াতাড়ি বেচে দিতে চান। শেয়ারবাজারেও ক্রেতা-বিক্রেতার এই টানাটানিই সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্সের মূল ধারণা।
ধরা যাক ছয় মাসে একটা শেয়ারের দাম তিনবার ৪০ টাকার আশেপাশে নেমে আবার উঠেছে, আর দুবার ৫৫ টাকার কাছে উঠে আবার নেমেছে। চার্ট বিশ্লেষকেরা বলবেন, ৪০ টাকার এলাকা সাপোর্ট আর ৫৫ টাকার এলাকা রেজিস্ট্যান্স। এর মানে এই নয় যে দাম কখনো ৪০-এর নিচে নামবে না বা ৫৫-এর ওপরে উঠবে না; শুধু এটুকু যে অতীতে এখানে দাম থেমেছিল। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- বাজারের আলাপ বুঝতে: "সাপোর্ট ভেঙে গেছে", "রেজিস্ট্যান্সে আটকে আছে" কথাগুলো খুব শোনা যায়। এর পেছনের যুক্তি আর সীমা জানলে কথাগুলো মেপে শুনতে পারবেন।
- নিজের মনের ফাঁদ চিনতে: "যে দামে কিনেছিলাম, সেখানে ফিরলেই বেচে দেব" এই চিন্তা অনেকের থাকে। এই একই মানসিকতা থেকেই রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয় বলে ধারণা করা হয়।
- গোল সংখ্যার টান বুঝতে: ১০০ বা ৫০ টাকার মতো গোল দামে অনেক অর্ডার জমা হয়। এতে দাম সেখানে অন্যরকম আচরণ করতে পারে।
- প্রমাণের ওজন বুঝতে: গবেষণায় এর পক্ষে কিছু প্রমাণ আছে, কিন্তু প্রভাব ছোট আর অনিশ্চিত। এটা জানলে কেউ "নিশ্চিত" বললে সতর্ক হতে পারবেন।
এমন জায়গা কেন তৈরি হয় বলে মনে করা হয়
- স্মৃতি ও আফসোস: যাঁরা আগে বেশি দামে কিনে লোকসানে আছেন, দাম সেখানে ফিরলে অনেকে বেচে বেরিয়ে যেতে চান। আবার যাঁরা আগে কম দামে কেনার সুযোগ হারিয়েছেন, দাম সেখানে নামলে কিনতে চান।
- গোল সংখ্যা: মানুষ কেনা-বেচার দাম প্রায়ই গোল সংখ্যায় ঠিক করেন, তাই অনেক অর্ডার একই দামে জমে।
- সবাই একই জিনিস দেখছেন: অনেকে একই চার্ট দেখে একই জায়গায় অর্ডার দিলে, কিছুটা হলেও ধারণাটা নিজেই নিজেকে সত্যি করতে পারে।
- ভূমিকা বদল: চার্ট বিশ্লেষকদের একটা প্রচলিত ধারণা, রেজিস্ট্যান্স একবার পরিষ্কারভাবে ভাঙলে পরে সেটা সাপোর্ট হয়ে যেতে পারে, আর সাপোর্ট ভাঙলে রেজিস্ট্যান্স।
- ভুয়া ভাঙন: দাম কোনো স্তর পেরিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসা খুব সাধারণ ঘটনা। তাই বিশ্লেষকেরা এগুলোকে নির্দিষ্ট রেখা নয়, একটা এলাকা হিসেবে দেখেন।
গবেষণা কী বলে
নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের অর্থনীতিবিদ ক্যারল অসলার ২০০০ সালে একটা পরীক্ষা করেন। জানুয়ারি ১৯৯৬ থেকে মার্চ ১৯৯৮ পর্যন্ত ছয়টি প্রতিষ্ঠান ডলার-মার্ক, ডলার-ইয়েন আর ডলার-পাউন্ডের জন্য যে সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্স প্রকাশ করেছিল, সেখানে দাম পৌঁছে প্রায় ৬০.৮% ক্ষেত্রে ফিরে গেছে। এলোমেলোভাবে বাছা স্তরে এই হার ছিল প্রায় ৫৬.২%। অর্থাৎ প্রকাশিত স্তরগুলো সামান্য বেশি কাজ করেছে, কিন্তু পার্থক্য মাত্র ৪–৫ শতাংশ পয়েন্ট।
একই গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলো মাত্র প্রায় ৩০% ক্ষেত্রে একই স্তরে একমত হয়েছিল, আর তারা যে স্তরকে "শক্ত" বলেছিল, তা বাস্তবে বেশি কাজ করেনি। লাভ করা যেত কি না, সেটাও পরীক্ষা করা হয়নি। অসলারের আরেকটা গবেষণায় (২০০২) দেখা যায়, মুদ্রাবাজারে কেনা-বেচার অর্ডার গোল সংখ্যার আশেপাশে জমা হয়। এগুলো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ফল; ঢাকার শেয়ারবাজারে একই রকম হবে, এমন ধরে নেওয়া যায় না।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- সাপোর্টকে মেঝে ভাবা: "এর নিচে নামবেই না"। খারাপ খবর বা পুরো বাজারের পতনে সাপোর্ট সহজেই ভেঙে যায়।
- ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর রেখা টানা। পেছন ফিরে তাকালে সবসময় নিখুঁত সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্স চোখে পড়ে; আগে থেকে চেনা অনেক কঠিন।
- একটা নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ককে নিখুঁত রেখা ধরা, এলাকা হিসেবে না দেখা।
- কোম্পানির খবর আর আয়-লাভ উপেক্ষা করে শুধু চার্টের রেখা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্স হলো অতীতে ক্রেতা-বিক্রেতার ভারসাম্য যেখানে বদলেছিল তার স্মৃতি, ভবিষ্যতের দেয়াল নয়।