কর আর সীমা বলতে কী বোঝায়
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আপনার আয়, আর আয়ের ওপর কর আছে। সরকার এই কর মুনাফা দেওয়ার সময়েই কেটে রাখে; একে বলে উৎসে কর বা ট্যাক্স ডিডাকটেড অ্যাট সোর্স। তাই ঘোষিত হারের পুরো মুনাফা আপনার ব্যাংক হিসাবে আসে না, কর কেটে বাকিটা আসে।
সীমা আসে দুই রূপে। এক, কত টাকার সঞ্চয়পত্র একজন কিনতে পারবেন তার ক্রয়সীমা। দুই, কাগজপত্রের সীমা: একটা অঙ্কের বেশি কিনতে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণ লাগে। এর সঙ্গে আছে হারের স্তর: মোট বিনিয়োগ বড় হলে মুনাফার হার সামান্য কম।
ধরা যাক অবসরপ্রাপ্ত নাজমা বেগমের সঞ্চয়পত্রে মাসে ১,০০০ টাকা মুনাফা হওয়ার কথা। ১০% কর কেটে তাঁর হিসাবে আসে ৯০০ টাকা। তাঁর বছরের মোট আয় করমুক্ত সীমার নিচে, তাই তিনি ভাবেন, "আমার তো কর দেওয়ারই কথা না, তাহলে এই ১০০ টাকা কেন কাটল?" নিয়ম অনুযায়ী এখন তিনি রিটার্ন জমা দিয়ে এই বাড়তি কাটা টাকা ফেরত চাইতে পারেন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- হাতে আসা আসল মুনাফা বুঝতে: তুলনা করতে হবে করের পরের অঙ্কে, ঘোষিত হারে নয়।
- ফেরতযোগ্য টাকা হাতছাড়া না করতে: কাটা কর এখন অগ্রিম কর, তাই আয় কম হলে রিটার্ন দিয়ে বাড়তি অংশ ফেরত পাওয়ার পথ আছে।
- বাড়তি কর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে: আয় বেশি হলে উল্টোটা হতে পারে, রিটার্নে আরও কর দিতে হতে পারে।
- কেনার আগে আটকে না যেতে: ক্রয়সীমা আর রিটার্নের প্রমাণের নিয়ম না জানলে ব্যাংক বা ডাকঘরে গিয়ে ফিরে আসতে হতে পারে।
মুনাফায় উৎসে কর: কত কাটে
আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ আর প্রতি বছরের অর্থ আইন ঠিক করে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কত কাটা হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোট বিনিয়োগ ছোট হলে ৫%, বড় হলে ১০% কাটা হতো; "ছোট" বলতে কোনো সময় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত, পরে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে সবার মুনাফা থেকে সমান ১০% কাটার খবর আসে, আর অর্থ বিল ২০২৬-এ সব সঞ্চয়পত্রে ১০% অগ্রিম করের প্রস্তাব করা হয়।
হার আর সীমা বাজেটে প্রায়ই বদলায়, কখনো আলাদা ঘোষণা ছাড়াই। মুনাফা থেকে কত কাটা হলো, তা জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের দেওয়া উৎসে কর কর্তনের সনদে দেখা যায়; রিটার্ন জমার সময় এটাই প্রমাণ।
চূড়ান্ত কর বনাম অগ্রিম কর
আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কাটা কর ছিল "চূড়ান্ত কর"। মানে, কাটা হয়ে গেলে ওই মুনাফা নিয়ে আর কোনো হিসাব নেই: আয় কম হলেও ফেরত নেই, আয় বেশি হলেও বাড়তি কর নেই। অর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে এটা "অগ্রিম কর"।
অগ্রিম কর মানে মুনাফাটা আপনার বছরের মোট আয়ের সঙ্গে যোগ হয়, তারপর আপনার নিজের করহারে কর হিসাব হয়, আর আগে কাটা টাকা সেই করের সঙ্গে সমন্বয় হয়। যাঁর আয় করমুক্ত সীমার নিচে, তিনি টিআইএন নিয়ে রিটার্ন জমা দিয়ে বাড়তি অংশ ফেরত চাইতে পারেন; খবর অনুযায়ী এই ফেরত রিটার্ন জমার ১২০ দিনের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে দেওয়ার কথা। আর যাঁর আয় উঁচু করহারে পড়ে, আগে তাঁর মুনাফায় ১০%-ই শেষ ছিল; এখন রিটার্নে বাকি কর দিতে হতে পারে।
কেনার সীমা, হারের স্তর আর কাগজপত্র
- ক্রয়সীমা: প্রতিটি স্কিমের নিজস্ব সীমা আছে, আর সাধারণ তিন স্কিম মিলিয়ে একক নামে মোট ৫০ লাখ, যৌথ নামে ১ কোটি টাকার কথা খবরে এসেছে। স্কিমভিত্তিক সীমা "ধরন ও মেয়াদ" পাঠে আছে।
- হারের স্তর: জানুয়ারি ২০২৫ থেকে সব স্কিম মিলিয়ে মোট বিনিয়োগ সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে এক হার, তার বেশি হলে সামান্য কম।
- রিটার্নের প্রমাণ: জুলাই ২০২৫-এর খবর অনুযায়ী মোট ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কিনতে রিটার্ন জমার প্রমাণ লাগে না, তার বেশি হলে লাগে। আগে এই সীমা ছিল ৫ লাখ টাকা।
- কর রেয়াত: সঞ্চয়পত্রসহ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ একটা সীমা পর্যন্ত ইনভেস্টমেন্ট রেয়াতের হিসাবে ধরা হয়; বিস্তারিত রেয়াতের পাঠে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক দুজনেই ৫,০০,০০০ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে বছরে ৬০,০০০ টাকা মুনাফা পান। ১০% উৎসে কর কাটে ৬,০০০ টাকা, হাতে আসে ৫৪,০০০ টাকা।
- প্রথম জনের মোট আয় করমুক্ত সীমার নিচে। তাঁর আসলে কর শূন্য, তাই রিটার্ন জমা দিয়ে ৬,০০০ টাকা ফেরত চাইতে পারেন।
- দ্বিতীয় জনের অন্য আয় বেশি, ধরা যাক এই মুনাফা পুরোটা ২৫% করহারে পড়ে। কর দাঁড়ায় ১৫,০০০ টাকা; আগে কাটা ৬,০০০ বাদে রিটার্নে আরও ৯,০০০ টাকা দিতে হয়।
ফল: একই সঞ্চয়পত্র, একই কাটা কর, কিন্তু শেষ হিসাব আলাদা। কাটা টাকাটা এখন একটা অগ্রিম, শেষ কথা নয়। হার, স্ল্যাব আর অঙ্ক উদাহরণের জন্য ধরা; প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- কাটা করকে এখনও চূড়ান্ত ভাবা, আর আয় কম হলেও ফেরত না চাওয়া, বা আয় বেশি হলে বাকি কর না দেওয়া।
- ঘোষিত মুনাফার হারে হিসাব করা, কর বাদ না দিয়ে।
- আগের বছরের কর-হার বা কাগজপত্রের সীমা ধরে নিয়ে কিনতে যাওয়া। এগুলো প্রায়ই বাজেটে বদলায়।
- উৎসে কর কর্তনের সনদ সংগ্রহ না করা, ফলে রিটার্নে কাটা কর দাবি করতে না পারা।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কাটা কর এখন একটা অগ্রিম: আপনার মোট আয়ের ওপর শেষ হিসাব হয়, আর সেই হিসাবে ফেরত বা বাড়তি কর, দুটোই হতে পারে।