BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

মেন্টাল অ্যাকাউন্টিং

টাকা কোথা থেকে এল বা কোন খাতে রেখেছি, তার ওপর ভিত্তি করে মনে মনে আলাদা "হিসাবের খাতা" খোলা, আর প্রতিটা খাতাকে আলাদা নিয়মে চালানো। কখনো এটা কাজে লাগে, কখনো চুপচাপ ক্ষতি করে।

ভিডিও আসছে
মেন্টাল অ্যাকাউন্টিং: সব টাকাই কি এক টাকা?

মেন্টাল অ্যাকাউন্টিং কী

হিসাবের দিক থেকে ১,০০০ টাকা সব জায়গায় একই ১,০০০ টাকা। কিন্তু মনে মনে আমরা টাকাকে আলাদা আলাদা খাতে ভাগ করি: "বেতনের টাকা", "ঈদ বোনাস", "বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা", "শেয়ারের লাভ", "বাজারের টাকা"। আর প্রতিটা খাতের টাকা আমরা আলাদাভাবে খরচ করি বা ঝুঁকিতে ফেলি। এটাকেই বলে মেন্টাল অ্যাকাউন্টিং।

ধারণাটা জনপ্রিয় করেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ রিচার্ড থেলার। এই কাজের জন্য তিনি ২০১৭ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল কমিটির ভাষায়, মানুষ সিদ্ধান্ত সহজ করতে মনে মনে আলাদা খাতা রাখে, আর প্রতিটা সিদ্ধান্তকে আলাদাভাবে বিচার করে, সব মিলিয়ে কী হলো তা না দেখে।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক করিম মাসে মাসে খুব হিসাব করে চলেন, ২০ টাকার রিকশা ভাড়া নিয়েও দরদাম করেন। কিন্তু ঈদ বোনাসের ২০,০০০ টাকা হাতে আসতেই এক বিকেলে প্রায় পুরোটা খরচ করে ফেলেন, কারণ মনে হয় এটা "বাড়তি টাকা"। অথচ বেতনের ২০,০০০ টাকা আর বোনাসের ২০,০০০ টাকায় একই জিনিস কেনা যায়। ঘটনাটা কাল্পনিক।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • "লাভের টাকা দিয়ে খেলা": শেয়ারের লাভকে "বাজারের টাকা" ভেবে অনেকে সেটা দিয়ে অনেক বেশি রিস্ক নেন, যেন ওটা হারালে কিছু যায় আসে না।
  • ধার রেখে সঞ্চয়: কম সুদে টাকা জমা রেখে একই সময়ে বেশি সুদে ধার বা ক্রেডিট কার্ডের দেনা টানা।
  • পোর্টফোলিওকে টুকরো করে দেখা: প্রতিটা ইনভেস্টমেন্টকে আলাদা খাতায় দেখলে পুরো পোর্টফোলিওর রিস্ক আর রিটার্ন চোখে পড়ে না।
  • ভালো দিকটাও আছে: ইমার্জেন্সি ফান্ড বা সন্তানের পড়াশোনার টাকা আলাদা খাতে রাখলে সেটা হুটহাট খরচ হওয়া কমে।

একটা বিখ্যাত পরীক্ষা: হারানো টিকিট

মনোবিজ্ঞানী অ্যামোস টভারস্কি আর ড্যানিয়েল কাহনেম্যান (১৯৮১) দুই দল মানুষকে দুটো পরিস্থিতি দেন। প্রথম দলকে বলা হয়: আপনি ১০ ডলারের টিকিট কেটে নাটক দেখতে যাবেন, গিয়ে দেখলেন পকেট থেকে ১০ ডলারের একটা নোট হারিয়ে গেছে। এখনো টিকিট কিনবেন? প্রায় ৮৮% বললেন, হ্যাঁ।

দ্বিতীয় দলকে বলা হয়: আপনি আগেই ১০ ডলারে টিকিট কিনেছিলেন, গিয়ে দেখলেন টিকিটটাই হারিয়ে গেছে। আরেকটা কিনবেন? মাত্র প্রায় ৪৬% বললেন, হ্যাঁ। দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতি একই ১০ ডলার। পার্থক্য শুধু মনে: দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মানুষ ভাবছে "নাটকের খাতে" ২০ ডলার খরচ হয়ে গেল।

বাংলাদেশি জীবনে কোথায় দেখা যায়

  • রেমিট্যান্স: বিদেশে কষ্ট করে আয় করা টাকা দেশে এলে পরিবার সেটাকে কখনো "বড় কাজের টাকা" ভেবে জমি বা বাড়িতে দেয়, আবার কখনো "বাড়তি টাকা" ভেবে দ্রুত খরচ করে। দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্নটা হওয়া উচিত সব আয়-খরচ মিলিয়ে কী দরকার।
  • সঞ্চয়পত্র বা এফডিআরের মুনাফা: মূল টাকা "ছোঁয়া যাবে না", কিন্তু মুনাফাটা "খরচের টাকা", এভাবে ভাবলে ইনফ্লেশনের পর আসল সঞ্চয় কমে যেতে পারে।
  • লটারি, প্রাইজ বন্ড বা উপহারের টাকা: "হঠাৎ পাওয়া টাকা" প্রায়ই সবচেয়ে কম ভেবে খরচ হয়।
  • শেয়ারে "মূল টাকা ফেরত এসেছে, এখন বাকিটা ফ্রি": আসলে বাকিটাও আপনারই টাকা, আর সেটা হারালে আপনিই হারান।

সবসময় খারাপ নয়

মেন্টাল অ্যাকাউন্টিং পুরোপুরি ভুলও নয়। বাজেটের খাম পদ্ধতি, আলাদা ইমার্জেন্সি ফান্ড, বা লক্ষ্য অনুযায়ী আলাদা সঞ্চয়, এগুলো সবই ইচ্ছা করে খাতা আলাদা রাখা, যাতে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে। সমস্যা হয় তখন, যখন খাতার নাম দেখে আমরা ভুলে যাই যে সব টাকাই এক পকেটের, আর সিদ্ধান্তটা পুরো ছবি দেখে নেওয়া দরকার।

হাতে-কলমে হিসাব

এক পকেট, দুই খাতা (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)
  1. ধরা যাক আপনার ১,০০,০০০ টাকা এক বছরের এফডিআরে আছে বছরে ৯% হারে। সুদ ৯,০০০ টাকা; উৎসে কর কাটলে আরও কম, ধরা যাক ৮,১০০ টাকা।
  2. একই সময়ে আপনার ১,০০,০০০ টাকার একটা ব্যক্তিগত ঋণ আছে বছরে ১৪% হারে। সরল হিসাবে বছরে সুদ প্রায় ১৪,০০০ টাকা।
  3. মনে মনে দুটো আলাদা খাতা: "সঞ্চয় বাড়ছে" আর "ঋণ শোধ চলছে"। কিন্তু টাকা একই পকেট থেকে আসছে আর যাচ্ছে।

ফল: দুই খাতা মিলিয়ে বছরে প্রায় ৫,৯০০ টাকা নিট খরচ। এটা কোনো পরামর্শ নয়; জরুরি টাকা হাতে রাখারও যুক্তি আছে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা দুই খাতা মিলিয়ে দেখে নেওয়াই ভালো হিসাব। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • লাভের টাকাকে "ফ্রি টাকা" ভেবে তা দিয়ে না বুঝে বেশি রিস্ক নেওয়া।
  • বোনাস, রেমিট্যান্স বা উপহারের টাকা বেতনের টাকার চেয়ে কম ভেবে খরচ করা।
  • কম সুদের সঞ্চয় আর বেশি সুদের ঋণ একসঙ্গে রেখে দুটোকে কখনো মিলিয়ে না দেখা।
  • প্রতিটা ইনভেস্টমেন্টকে আলাদা দেখে পুরো পোর্টফোলিওর রিস্ক ভুলে যাওয়া।
মনে রাখুন

টাকার গায়ে খাতার নাম লেখা থাকে না: বোনাস, রেমিট্যান্স, লাভ, সবই আপনার একই সম্পদ, তাই সিদ্ধান্ত নিন পুরো ছবি দেখে।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
রিচার্ড থেলার, মেন্টাল অ্যাকাউন্টিং তত্ত্ব ও ২০১৭ সালের নোবেল: নোবেলপ্রাইজ.অর্গ, অর্থনীতি ২০১৭-এর প্রেস রিলিজ, ৯ অক্টোবর ২০১৭, দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
হারানো টিকিট পরীক্ষা, ৮৮% বনাম ৪৬%: Southworth ও Swoyer, "Critical Reasoning: A User’s Manual", অধ্যায় ১৮.২ "Psychological Accounting", LibreTexts, দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
মূল গবেষণা: Tversky ও Kahneman, "The Framing of Decisions and the Psychology of Choice", Science, ১৯৮১
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।