কোম্পানি-নির্দিষ্ট রিস্ক কী
শেয়ারের রিস্ককে দুই ভাগে ভাবা যায়। একটা হলো মার্কেট রিস্ক: অর্থনীতি, সুদের হার বা পুরো বাজারের মেজাজ, যা প্রায় সব শেয়ারকে একসঙ্গে নাড়ায়। অন্যটা কোম্পানি-নির্দিষ্ট রিস্ক, যাকে আনসিস্টেমেটিক বা আইডিওসিনক্র্যাটিক রিস্কও বলে: শুধু ওই একটা কোম্পানির ভেতরের বা তার আশপাশের ঘটনা, যার সঙ্গে পুরো বাজারের সম্পর্ক নেই।
একটা কোম্পানির মালিক হিসেবে আপনি তার সব সিদ্ধান্তের ফল ভাগ করে নেন। ব্যবস্থাপনা ভুল করলে, কারখানায় আগুন লাগলে, বড় ক্রেতা চলে গেলে বা হিসাবের খাতায় গরমিল ধরা পড়লে, সেই কোম্পানির শেয়ারের দাম পড়বে, বাকি বাজার যা-ই করুক।
ধরা যাক এক বছরে পুরো বাজার ভালো যাচ্ছে, বেশিরভাগ শেয়ারের দাম বাড়ছে। এর মধ্যে একটা কাল্পনিক জুস কোম্পানির পণ্যে ভেজাল ধরা পড়ল, সরকার বিক্রি বন্ধ করল, ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিল। কোম্পানির আয় হঠাৎ কমে গেল আর শেয়ারের দাম অর্ধেক হয়ে গেল। বাজারের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই; এটাই কোম্পানি-নির্দিষ্ট রিস্ক। কোম্পানি আর ঘটনাটি কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- এক শেয়ারে বড় ক্ষতি থেকে বাঁচতে: পুরো বাজার শূন্য হওয়া বিরল, কিন্তু একটা কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে শেয়ারের মূল্য প্রায় শূন্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
- কোন রিস্ক কমানো যায় বুঝতে: এই রিস্ক ডাইভারসিফিকেশনে অনেকটাই কমে, কারণ সব কোম্পানিতে একসঙ্গে একই সমস্যা হয় না। মার্কেট রিস্ক এভাবে কমে না।
- "ভালো গল্প" আর ভালো ইনভেস্টমেন্ট আলাদা করতে: একটা কোম্পানির যত সুনামই থাকুক, ভেতরের সমস্যা সবসময় বাইরে থেকে দেখা যায় না।
- কোন তথ্য পড়তে হবে জানতে: বার্ষিক প্রতিবেদন, অডিটরের মতামত আর মূল্য-সংবেদনশীল ঘোষণাই এই রিস্কের প্রধান খবর।
রিস্ক কোথা থেকে আসে
- ব্যবসার রিস্ক: চাহিদা কমা, নতুন প্রতিযোগী, কাঁচামালের দাম বাড়া, একজন বড় ক্রেতার ওপর বেশি নির্ভরতা।
- আর্থিক রিস্ক: বেশি ধার থাকলে ভালো সময়ে লাভ বাড়ে, কিন্তু খারাপ সময়ে সুদ দিতেই মুনাফা শেষ হয়ে যায়, আর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কিছু থাকে না।
- গভর্ন্যান্স ও প্রতারণার রিস্ক: হিসাবে গরমিল, উদ্যোক্তা বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সন্দেহজনক লেনদেন, ছোট শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ উপেক্ষা।
- ঘটনার রিস্ক: আগুন, বন্যা, মামলা, লাইসেন্স বাতিল, বা শুধু ওই খাতের জন্য নতুন নিয়ম বা কর।
- লেনদেনের রিস্ক: ছোট কোম্পানির শেয়ার কম কেনাবেচা হয়, তাই খারাপ খবরে বিক্রি করতে চাইলে ক্রেতা না-ও পাওয়া যেতে পারে।
এক-একটা শেয়ারের ফল কতটা ছড়ানো
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হেনড্রিক বেসেমবাইন্ডার ১৯২৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৬,০০০ শেয়ার বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, প্রায় ৫৮% শেয়ার তাদের পুরো জীবনে স্বল্পমেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বিলের চেয়েও কম রিটার্ন দিয়েছে। ট্রেজারি বিলের ওপরে যত সম্পদ তৈরি হয়েছে, তার পুরোটা এসেছে মাত্র ৪%-এর কিছু বেশি শেয়ার থেকে। অর্থাৎ বাজার সামগ্রিকভাবে ভালো করলেও বেশিরভাগ একক শেয়ার তা করেনি।
সুনাম থাকলেও ঝুঁকি থাকে। জার্মানির পেমেন্ট কোম্পানি ওয়্যারকার্ড ছিল দেশটির প্রধান শেয়ার সূচক ড্যাক্সের সদস্য, একসময় বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২,৮০০ কোটি ডলার। ২০২০ সালের জুনে জানা যায় হিসাবের খাতায় দেখানো ১৯০ কোটি ইউরো নগদ টাকার অস্তিত্বই সম্ভবত নেই। অডিটর হিসাবে সই করতে অস্বীকার করার পর এক সপ্তাহের মধ্যে শেয়ারের দাম প্রায় ৯৮% পড়ে যায়, আর কোম্পানিটা দেউলিয়া হওয়ার আবেদন করে। একই সময়ে পুরো জার্মান বাজারে এমন কিছু ঘটেনি।
সূত্র: বেসেমবাইন্ডার, অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি, ২০১৮
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| ট্রেজারি বিলের চেয়ে খারাপ | ভালো | |
|---|---|---|
| সব শেয়ার | ৫৮ | ৪২ |
যেসব সংকেতে প্রশ্ন জাগা উচিত
- অডিটরের "কোয়ালিফায়েড" মতামত বা "গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ": অডিটর নিজেই হিসাবে কোনো সমস্যা বা অনিশ্চয়তা দেখছেন।
- এজিএম বা লভ্যাংশ বাদ পড়া: বাংলাদেশে এর ফলে কোম্পানি Z ক্যাটাগরিতে চলে যেতে পারে।
- মুনাফা বাড়ছে কিন্তু নগদ টাকা আসছে না, অথবা ধার দ্রুত বাড়ছে।
- ব্যবসার খবর ছাড়াই দাম আর লেনদেন হঠাৎ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া, বা গুজবনির্ভর "টিপস"।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- পরিচিত বা নামী কোম্পানি হলে কোম্পানি-নির্দিষ্ট রিস্ক নেই ভাবা।
- বাজার ভালো যাচ্ছে বলে ধরে নেওয়া নিজের প্রতিটা শেয়ারও ভালো করবে।
- দাম অনেক পড়েছে বলে কোনো শেয়ারকে "আর কত পড়বে" ভেবে বারবার কেনা, কেন পড়ছে না জেনেই।
- বার্ষিক প্রতিবেদন আর অডিটরের মতামত না পড়ে শুধু দাম আর গুজব দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
একটা কোম্পানি বাজারের চেয়ে অনেক বেশি পড়তে পারে, এমনকি শূন্যও হতে পারে; এই রিস্ক এড়ানো যায় না, কিন্তু অনেকগুলো আলাদা কোম্পানিতে ভাগ করে এর প্রভাব অনেকটা কমানো যায়।