BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

সরকারি বাজেট

এক বছরে সরকার কোথা থেকে কত টাকা আয় করবে আর কোথায় কত খরচ করবে, তার পরিকল্পনা। আয়ের চেয়ে খরচ বেশি হলে বাকিটা ধার করতে হয়, আর সেই ধারের প্রভাব পড়ে সুদের হার থেকে সঞ্চয়পত্র পর্যন্ত।

ভিডিও আসছে
সরকারি বাজেট: দেশের সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব

সরকারি বাজেট কী

সরকারি বাজেট হলো এক অর্থবছরের জন্য সরকারের আয় আর ব্যয়ের পরিকল্পনা। বাংলাদেশে অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই, শেষ হয় পরের বছরের ৩০ জুন। সাধারণত জুন মাসে অর্থমন্ত্রী সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেন, আলোচনার পর তা পাস হয়, আর ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়।

বাজেটে শুধু খরচের তালিকা থাকে না। কোন জিনিসে কর বাড়ল বা কমল, আয়করের নিয়ম কী হলো, সঞ্চয়ের মুনাফায় কত কর কাটা হবে, এসব পরিবর্তনও সাধারণত বাজেটের সঙ্গে অর্থ আইনে আসে। তাই বাজেট সরাসরি আপনার পকেটেও প্রভাব ফেলে।

একটা উদাহরণ

একটা পরিবারের কথা ভাবুন। মাসে আয় ৫০,০০০ টাকা, কিন্তু বাসা ভাড়া, বাজার, পড়াশোনা, আর বাড়ি মেরামতের কিস্তি মিলিয়ে খরচ ৬০,০০০ টাকা। বাকি ১০,০০০ টাকা তাঁদের ধার করতে হয়, আর পরের মাস থেকে সেই ধারের সুদও খরচের তালিকায় যোগ হয়। সরকারের বাজেটও অনেকটা এভাবে চলে, শুধু অঙ্কটা লাখ কোটি টাকায়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • করের নিয়ম জানতে: আয়কর, সঞ্চয়ের মুনাফায় উৎসে কর, শেয়ারের লভ্যাংশে কর, এসবের পরিবর্তন সাধারণত বাজেটেই আসে।
  • সুদের হার বুঝতে: সরকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বেশি ধার নিলে ট্রেজারি বিল-বন্ডের ইল্ড বাড়তে পারে, আর ব্যবসার জন্য লোনের টাকায় টান পড়তে পারে।
  • সঞ্চয়পত্রের খবর বুঝতে: সঞ্চয়পত্র সরকারের ধার নেওয়ার একটা উৎস, তাই বাজেটে এর থেকে কত ধার নেওয়ার লক্ষ্য, সেটা সঞ্চয়পত্রের নীতির সঙ্গে জড়িত।
  • অর্থনীতির দিক বুঝতে: রাস্তা, বিদ্যুৎ বা সামাজিক সুরক্ষায় খরচ অর্থনীতির চাহিদা আর বিভিন্ন খাতের ব্যবসাকে প্রভাবিত করে।

বাজেটের প্রধান অংশ

  • রাজস্ব আয়: সবচেয়ে বড় অংশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদায় করা কর, যেমন ভ্যাট, আয়কর আর আমদানি শুল্ক। এর বাইরে আছে এনবিআর-বহির্ভূত কর আর কর ছাড়া অন্য আয়, যেমন ফি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ।
  • পরিচালন ব্যয়: সরকার চালানোর নিয়মিত খরচ, যেমন বেতন-ভাতা, ভর্তুকি আর আগের ধারের সুদ।
  • উন্নয়ন ব্যয়: নতুন রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্কুল-হাসপাতালের মতো প্রকল্পের খরচ। এর বড় অংশ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)।
  • বাজেট ঘাটতি: মোট খরচ থেকে মোট আয় বাদ দিলে যা থাকে। এটা মেটানো হয় দেশের ভেতর থেকে (ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র) আর বিদেশ থেকে (ঋণ ও অনুদান) ধার করে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাজেট

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল প্রায় ৭.৯০ লাখ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১১ জুন ২০২৬-এ পেশ করা বাজেটের আকার প্রায় ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা। এতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য প্রায় ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা (এর মধ্যে এনবিআরের প্রায় ৬.০৪ লাখ কোটি), আর ঘাটতি প্রায় ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩.৬%।

একই বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধে বরাদ্দ প্রায় ১.২৭ লাখ কোটি টাকা, আর এডিপি প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশে রাজস্ব আদায় জিডিপির প্রায় ৮%-এর কাছাকাছি। এগুলো প্রস্তাবিত লক্ষ্য; বছরের মাঝে সংশোধিত বাজেট হয়, আর আসল আয়-ব্যয় লক্ষ্য থেকে আলাদা হতে পারে। সর্বশেষ তথ্য অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশ করে।

বাজেটের খবর পড়ার কয়েকটা টিপস

  • শুধু মোট অঙ্ক নয়, জিডিপির শতাংশ দেখুন। ইনফ্লেশন আর অর্থনীতি বড় হওয়ায় টাকার অঙ্ক প্রায় প্রতি বছরই বাড়ে।
  • "প্রস্তাবিত", "সংশোধিত" আর "প্রকৃত" বাজেট আলাদা জিনিস। খবরে কোনটার কথা হচ্ছে খেয়াল করুন।
  • আপনার জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাধারণত অর্থ আইনে: আয়করের ধাপ, রিটার্নের নিয়ম, সঞ্চয়ের মুনাফায় উৎসে কর।

হাতে-কলমে হিসাব

২০২৬-২৭ বাজেট, ছোট করে দেখা
  1. মোট খরচ প্রায় ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা, আয়ের লক্ষ্য প্রায় ৬.৯৫ লাখ কোটি। প্রতি ১০০ টাকা খরচের মধ্যে প্রায় ৭৪ টাকা আসবে রাজস্ব থেকে, প্রায় ২৬ টাকা ধার করে।
  2. সুদ পরিশোধ প্রায় ১.২৭ লাখ কোটি টাকা: প্রতি ১০০ টাকা খরচের প্রায় সাড়ে ১৩ টাকা যায় আগের ধারের সুদে।
  3. ঘাটতি প্রায় ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা। ৩৬৫ দিনে ভাগ করলে, সরকারকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা ধার করতে হবে।

ফল: বাজেটকে "প্রতি ১০০ টাকায়" ভেঙে দেখলে বড় সংখ্যাগুলো সহজে বোঝা যায়: কত অংশ নিজের আয় থেকে, কত অংশ ধার, আর কত অংশ যায় পুরোনো ধারের সুদে।

প্রতি ১০০ টাকা খরচ কোথা থেকে আসবেপ্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭
প্রতি ১০০ টাকা
৭৪%২৬%

সূত্র: দ্য ডেইলি ইত্তেফাক, ১১ জুন ২০২৬

সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
রাজস্বধার
প্রতি ১০০ টাকা৭৪২৬

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • বাজেটের মোট অঙ্ক আগের বছরের চেয়ে বড় দেখেই ধরে নেওয়া যে সরকার আসলে অনেক বেশি খরচ করছে। ইনফ্লেশন আর জিডিপির তুলনায় দেখতে হয়।
  • প্রস্তাবিত বাজেটের করের পরিবর্তনকে চূড়ান্ত ভাবা। পাস হওয়ার আগে বদলাতে পারে, তাই চূড়ান্ত অর্থ আইন দেখা দরকার।
  • ভাবা যে বাজেট শুধু সরকারের ব্যাপার। কর, সুদের হার আর সঞ্চয়পত্রের নিয়মের মাধ্যমে এটা আপনার সঞ্চয়েও পৌঁছায়।
  • ঘাটতি শুনলেই সেটাকে ভালো বা খারাপ বলে ধরে নেওয়া। কতটা ঘাটতি উপযুক্ত, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ভিন্নমত আছে; আকার, কীসে খরচ আর কীভাবে অর্থায়ন, সবই দেখতে হয়।
মনে রাখুন

বাজেট দেশের এক বছরের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা; এর কর, ধার আর সুদের হিসাব আপনার আয়কর, সুদের হার আর সঞ্চয়পত্র পর্যন্ত পৌঁছায়।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
২০২৬-২৭ বাজেট ৯.৩৮ লাখ কোটি, রাজস্ব ৬.৯৫ লাখ কোটি (এনবিআর ৬.০৪), ঘাটতি ২.৪৩ লাখ কোটি, সুদ ১.২৭ লাখ কোটি, ১১ জুন ২০২৬-এ পেশ, ১ জুলাই থেকে কার্যকর: দ্য ডেইলি ইত্তেফাক (ইংরেজি), "Cabinet approves proposed national budget for FY27", ১১ জুন ২০২৬ ↗
ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৩.৬%; রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮%: দ্য ডেইলি স্টার, "Beyond the deficit debate in FY27 budget", ১২ জুন ২০২৬ ↗
২০২৫-২৬ বাজেট ৭,৯০,০০০ কোটি টাকা: দ্য ডেইলি স্টার, "Govt unveils Tk 790,000 crore budget for FY26", জুন ২০২৫ ↗
২০২৬-২৭ এডিপি ৩ লাখ কোটি টাকা (এনইসি অনুমোদিত): প্রথম আলো ইংলিশ, "NEC approves Tk 3 lakh crore ADP for FY27", ১৮ মে ২০২৬ ↗
বাজেট নথি ও সর্বশেষ তথ্য: অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।