ট্যাক্সের প্রভাব বলতে কী বোঝায়
ইনভেস্টমেন্ট থেকে যে আয় আসে, যেমন এফডিআরের সুদ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা, শেয়ারের লভ্যাংশ বা শেয়ার বেচে লাভ, তার বেশিরভাগের ওপরই কর আছে। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে এই কর উৎসেই কেটে রাখা হয়, অর্থাৎ টাকা আপনার হাতে আসার আগেই। তাই অনেকে টেরই পান না যে রিটার্নের একটা অংশ কর হিসেবে চলে যাচ্ছে।
দুটো ইনভেস্টমেন্টের তুলনা করতে হলে তাই করের আগের হার নয়, করের পরের হার দেখতে হয়। একটার হার বেশি হলেও কর বেশি হলে হাতে কম আসতে পারে। আবার কোনো আয়ে কর কম বা একটা সীমা পর্যন্ত ছাড় থাকলে, কম হারেও হাতে বেশি থাকতে পারে।
ধরা যাক জামিল ব্যাংকে ২,০০,০০০ টাকার এফডিআর করলেন বছরে ১০% সুদে। বছর শেষে সুদ ২০,০০০ টাকা, কিন্তু তাঁর টিআইএন নেই, তাই ১৫% উৎসে কর কাটা গেল: হাতে এল ১৭,০০০ টাকা। তাঁর বোনের টিআইএন থাকায় একই এফডিআরে কর কাটে ১০%, হাতে আসে ১৮,০০০ টাকা। একই ব্যাংক, একই হার, শুধু টিআইএনের কারণে বছরে ১,০০০ টাকার পার্থক্য। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- সঠিক তুলনা করতে: ভিন্ন ভিন্ন আয়ে ভিন্ন হারে কর লাগে। করের পরের রিটার্ন না দেখলে আপেলের সঙ্গে কমলার তুলনা হয়ে যায়।
- আসল লাভ বুঝতে: কর কাটার পর যা থাকে তা থেকে ইনফ্লেশন বাদ দিলে তবেই টাকার আসল বৃদ্ধি বোঝা যায়।
- কর কম্পাউন্ড হয়: প্রতি বছর কাটা করের টাকা আর ভবিষ্যতে রিটার্ন আনে না। লম্বা সময়ে ছোট হারের পার্থক্যও বড় অঙ্ক হয়ে যায়।
- নিয়ম বদলায়: বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরের অর্থ আইনে বিনিয়োগ-আয়ের কর বদলাতে পারে। পুরোনো হিসাব দিয়ে আজকের সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হতে পারে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক নিয়ম (বদলাতে পারে)
নিচের হারগুলো আয়কর আইন ২০২৩ আর সংশ্লিষ্ট বছরের অর্থ আইন থেকে নেওয়া, আর প্রতি বছরের বাজেটে বদলাতে পারে। ইনভেস্ট করার বছরে সর্বশেষ নিয়ম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রকাশনা থেকে মিলিয়ে নিন।
- ব্যাংকের সুদ (এফডিআর, সেভিংস): ২০১২–১৩ অর্থবছর থেকে উৎসে কর ছিল টিআইএন থাকলে ১০%, না থাকলে ১৫%।
- সঞ্চয়পত্রের মুনাফা: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎসে কর ছিল ৫% (মোট ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে) বা ১০%, যা চূড়ান্ত কর হিসেবে ধরা হতো। ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে এটা অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হয়, অর্থাৎ বাড়তি কাটা হলে রিটার্ন দিয়ে ফেরত চাওয়া যায়; বাজেটে সব সঞ্চয়পত্রে ১০% কাটার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
- শেয়ারের লভ্যাংশ: অর্থ আইন ২০২৬ (২০২৬–২৭) অনুযায়ী ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর লভ্যাংশে সমান ১৫% কর, যা চূড়ান্ত কর। আগে উৎসে ১০–১৫% কেটে পরে আয়ের স্তর অনুযায়ী বাড়তি কর লাগতে পারত।
- তালিকাভুক্ত শেয়ার বেচে লাভ (মূলধনি মুনাফা): এনবিআরের নভেম্বর ২০২৪-এর পরিবর্তন অনুযায়ী বছরে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করমুক্ত, তার বেশি অংশে ১৫%। উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্লেসমেন্ট শেয়ারে এই ছাড় প্রযোজ্য নয়।
কর কমানোর বৈধ উপায়গুলো বোঝা
- টিআইএন নেওয়া: অনেক ক্ষেত্রে টিআইএন থাকলে উৎসে কর কম কাটে, আর বাড়তি কাটা কর রিটার্ন দিয়ে ফেরত চাওয়ার পথও খোলে।
- বিনিয়োগ কর রেয়াত: আইনে তালিকাভুক্ত কিছু বিনিয়োগ করলে মোট আয়করের ওপর রেয়াত পাওয়া যায়। কোন বিনিয়োগ গণ্য আর সীমা কত, তা আয়কর আইন ও প্রতি বছরের অর্থ আইনে ঠিক হয়।
- বিক্রি না করা পর্যন্ত মূলধনি মুনাফায় কর নেই: শেয়ারের দাম বাড়লেও যতক্ষণ বিক্রি করছেন না, ততক্ষণ সেই লাভে কর আসে না। তাই ঘন ঘন কেনাবেচা কর ও খরচ দুটোই বাড়াতে পারে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ১,০০,০০০ টাকা বছরে ১০% সুদে রাখা হলো, প্রতি বছরের সুদ আবার একই হারে রাখা হলো, টানা ১০ বছর।
- কোনো কর না থাকলে: ১০ বছর পরে প্রায় ২,৫৯,৪০০ টাকা।
- প্রতি বছর ১০% কর কাটলে (নিট হার ৯%): প্রায় ২,৩৬,৭০০ টাকা।
- প্রতি বছর ১৫% কর কাটলে (নিট হার ৮.৫%): প্রায় ২,২৬,১০০ টাকা।
ফল: ১০% আর ১৫% করের মধ্যে ১০ বছরে পার্থক্য প্রায় ১০,৬০০ টাকা, যা প্রথম বছরের ৫০০ টাকার পার্থক্যের চেয়ে অনেক বড়, কারণ কর কম্পাউন্ড হয়। এরপর ইনফ্লেশন বাদ দিলে তবেই আসল বৃদ্ধি বোঝা যাবে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু বিজ্ঞাপনের হার দেখে তুলনা করা, করের পরের হার না দেখা।
- টিআইএন না নেওয়া, ফলে বছরের পর বছর বেশি হারে কর কাটতে দেওয়া।
- গত বছরের করের নিয়ম ধরে নিয়ে এ বছরের সিদ্ধান্ত নেওয়া। অর্থ আইনে নিয়ম প্রায়ই বদলায়।
- শুধু কর বাঁচাতে এমন কিছুতে টাকা রাখা, যার রিস্ক বা মেয়াদ আপনার প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে না। করছাড় ভালো, কিন্তু সিদ্ধান্তের একমাত্র কারণ হওয়া উচিত নয়।
হাতে কত আসবে, সেটাই আসল রিটার্ন: সবসময় করের পরের হার দিয়ে তুলনা করুন, আর মনে রাখুন করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে।