অপারচুনিটি কস্ট কী
আমাদের টাকা, সময় আর শক্তি সীমিত। তাই একটা জিনিস বেছে নিলে অন্য কিছু ছাড়তেই হয়। যা ছেড়ে দিলেন, তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিকল্পটার মূল্যই হলো অপারচুনিটি কস্ট। এটা রসিদে লেখা থাকে না, কিন্তু খরচ হিসেবে একেবারেই আসল।
যেমন, শুক্রবারের পুরো বিকেল আড্ডায় কাটালে তার অপারচুনিটি কস্ট হতে পারে সেই সময়ে একটা টিউশনি থেকে আয়, বা পরীক্ষার পড়া। আড্ডা ভুল সিদ্ধান্ত নয়; শুধু বুঝতে হবে, এর বদলে কী ছাড়লেন।
ধরা যাক রাফি বিয়ের অনুষ্ঠানে খরচের জন্য ৫,০০,০০০ টাকা জমিয়েছে। বড় আয়োজনের আসল খরচ শুধু ৫ লাখ টাকা নয়, বরং ওই টাকা দিয়ে আর যা করা যেত: হয়তো কয়েক বছরের জন্য কোথাও জমা রেখে বাড়তি আয়, বা একটা ছোট ব্যবসার শুরু। কোনটা ঠিক, সেটা রাফির নিজের মূল্যবোধের ব্যাপার। অপারচুনিটি কস্ট শুধু দুটো বিকল্প পাশাপাশি দেখতে সাহায্য করে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- অলস টাকার খরচ দেখতে: ঘরে বা কম সুদের জায়গায় পড়ে থাকা টাকার অপারচুনিটি কস্ট হলো অন্য কোথাও রাখলে যে রিটার্ন পাওয়া যেত, তার সঙ্গে ঝুঁকি আর লিকুইডিটির পার্থক্যও মাথায় রেখে।
- লোনের আসল খরচ বুঝতে: ধার করা টাকায় কিছু কিনলে প্রতি মাসের কিস্তির টাকাটা আর সঞ্চয় বা ইনভেস্টমেন্টে যেতে পারে না।
- "লসে বিক্রি করব না" ফাঁদ এড়াতে: দাম পড়ে যাওয়া কোনো ইনভেস্টমেন্ট ধরে রাখারও একটা অপারচুনিটি কস্ট আছে, কারণ সেই টাকা অন্য কোথাও কাজে লাগানো যেত।
- সময়ের দাম বুঝতে: নিজে সব কিছু করা বনাম শেখা বা দক্ষতা বাড়ানো, এসব সিদ্ধান্তেও সময়ের অপারচুনিটি কস্ট কাজ করে।
রিস্ক মিলিয়ে তুলনা করুন
অপারচুনিটি কস্টকে অনেকে ভুলভাবে ব্যবহার করেন: "শেয়ারে তো ২০% লাভ হতে পারত, তাই সঞ্চয়ী হিসাবে টাকা রাখায় আমার ২০% ক্ষতি হলো।" কিন্তু যে বিকল্পে রিটার্ন বেশি, সেখানে সাধারণত ঝুঁকিও বেশি, আর টাকা দরকারের সময় হাতে না-ও পেতে পারেন।
তাই ঠিক তুলনা হলো একই রকম ঝুঁকি আর একই রকম মেয়াদের বিকল্পের সঙ্গে। জরুরি তহবিলের অপারচুনিটি কস্ট মাপতে হবে অন্য নিরাপদ, সহজে তোলা যায় এমন জায়গার সঙ্গে তুলনা করে, শেয়ার বাজারের সেরা বছরের সঙ্গে নয়।
যা অপারচুনিটি কস্ট নয়: সাংক কস্ট
যে টাকা বা সময় আগেই খরচ হয়ে গেছে এবং ফেরত আসবে না, তাকে বলে সাংক কস্ট। সামনের সিদ্ধান্তে এর কোনো ভূমিকা থাকা উচিত নয়, তবু মানুষ প্রায়ই এর পেছনে ছোটে।
- "এত টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছি, তাই অসুস্থ হলেও সিনেমা দেখতেই হবে": টিকিটের টাকা তো যাওয়ারই; আসল প্রশ্ন হলো এখন বাসায় বিশ্রাম ভালো, না হলে বসে থাকা।
- "এই শেয়ারে ইতিমধ্যে অনেক লস, তাই আরও কিনে গড় কমাব": আগের লস সাংক কস্ট। সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত এখনকার তথ্যের ভিত্তিতে, আগের কেনা দামের ভিত্তিতে নয়।
প্রতিদিনের জীবনে অপারচুনিটি কস্ট
- পড়াশোনা: মাস্টার্স বা পেশাদার কোর্সের খরচ শুধু ফি নয়, পড়ার সময়ে যে বেতন বা অভিজ্ঞতা পাওয়া যেত, সেটাও।
- বাসা কেনা বনাম ভাড়া: নিজের বাসায় থাকলে ভাড়া লাগে না, কিন্তু ডাউন পেমেন্টের টাকা অন্য কোথাও আয় করতে পারত।
- ব্যবসায় নিজের সময়: নিজের দোকানে বসলে নিজের শ্রমের "বেতন" ধরা হয় না, কিন্তু চাকরি করলে যা পেতেন সেটা আসল খরচ।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক আপনার হাতে ১,০০,০০০ টাকা আছে, যা এক বছর লাগবে না। বিকল্প ক: এমন জায়গায় রাখা যেখানে বছরে ২% পাওয়া যায়, টাকা যখন খুশি তোলা যায়।
- বিকল্প খ: একই রকম নিরাপদ কিন্তু এক বছরের জন্য আটকে রাখা জায়গা, যেখানে বছরে ৯% পাওয়া যায়।
- বিকল্প ক বেছে নিলে আয় ২,০০০ টাকা; খ বেছে নিলে ৯,০০০ টাকা। পার্থক্য ৭,০০০ টাকা। এটাই ক-এর অপারচুনিটি কস্ট, যার বিনিময়ে আপনি পাচ্ছেন যেকোনো সময় টাকা তোলার সুবিধা।
ফল: কোনটা "ঠিক" তা নির্ভর করে ওই সুবিধা আপনার কাছে ৭,০০০ টাকার চেয়ে বেশি মূল্যবান কি না। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র; কর আর ইনফ্লেশন এখানে বাদ রাখা হয়েছে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু নগদ খরচ দেখা, ছেড়ে দেওয়া বিকল্প হিসাবে না ধরা।
- অনেক বেশি ঝুঁকির বিকল্পের সেরা ফলের সঙ্গে নিরাপদ বিকল্পের তুলনা করে নিজেকে "লসে" ভাবা।
- আগে খরচ হয়ে যাওয়া টাকা (সাংক কস্ট) উদ্ধারের জন্য নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া।
- নিজের সময়কে বিনা মূল্যের ধরে নেওয়া।
প্রতিটি সিদ্ধান্তে জিজ্ঞেস করুন: "এর বদলে আমি কী ছেড়ে দিচ্ছি?" যা ছাড়ছেন, সেটাও খরচের অংশ।