ডিসিএফ কী
আজকের ১০০ টাকা আর এক বছর পরের ১০০ টাকা সমান নয়। আজকের টাকা এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রে রাখলে বছর শেষে বেশি হয়, আর ভবিষ্যতের টাকা আসবে কি না, তাতেও কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকে। একে বলে টাকার সময়-মূল্য।
ডিসিএফ এই ধারণাটাকেই একটা ব্যবসার ওপর প্রয়োগ করে। ভবিষ্যতের প্রতি বছরের নগদ প্রবাহকে একটা হার (ডিসকাউন্ট রেট) দিয়ে ভাগ করে আজকের মূল্যে আনা হয়, তারপর সব যোগ করা হয়। যোগফলটাই ব্যবসার ইনট্রিনসিক ভ্যালুর একটা আন্দাজ।
ধরা যাক এক আত্মীয় বললেন, "আজ তোমাকে ১,০০,০০০ টাকা দেব, অথবা ঠিক এক বছর পরে ১,১০,০০০ টাকা।" আপনি যদি নিশ্চিতভাবে বছরে ১০% পেতে পারেন, তবে দুটো প্রায় সমান: ১,১০,০০০ ÷ ১.১০ = ১,০০,০০০। কিন্তু টাকাটা পাওয়া নিয়ে সন্দেহ থাকলে আপনি আজকের টাকাই বেশি পছন্দ করবেন। পরের টাকাকে এভাবে "ছোট" করে আজকের মূল্যে আনাই ডিসকাউন্টিং। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- অনুমানগুলো খোলাখুলি সামনে আনে: কত বৃদ্ধি, কত রিস্ক, কত বছর, সবই লিখে ফেলতে হয়, তাই কোথায় দুর্বলতা তা দেখা যায়।
- সুদের হার বাড়লে শেয়ারের দাম কেন চাপে পড়ে, তা ব্যাখ্যা করে: ডিসকাউন্ট রেট বাড়লে ভবিষ্যতের টাকার আজকের মূল্য কমে।
- দূর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি কেন কম দামি, তা দেখায়: ২০ বছর পরের টাকা আজ অনেক কম মূল্যের।
- বাজারদর কী অনুমান করে বসে আছে, তা উল্টো দিক থেকে যাচাই করা যায়: এই দাম যুক্তিসঙ্গত হতে হলে কোম্পানিকে কত দ্রুত বাড়তে হবে?
চারটি ধাপ
- ১. ফ্রি ক্যাশ ফ্লো আন্দাজ: খরচ আর ব্যবসায় দরকারি নতুন বিনিয়োগের পরে মালিকদের জন্য যে নগদ টাকা থাকে। সিএফএ ইনস্টিটিউট সতর্ক করে যে নিট মুনাফা বা ইবিআইটিডিএ-কে সরাসরি নগদ প্রবাহ ধরা ঠিক নয়।
- ২. ডিসকাউন্ট রেট ঠিক করা: এই রিস্কের জন্য আপনি বছরে কত রিটার্ন চান। সাধারণত সরকারি বন্ডের মতো প্রায় ঝুঁকিহীন হারের ওপর রিস্কের জন্য বাড়তি একটা অংশ যোগ করা হয়।
- ৩. টার্মিনাল ভ্যালু: কয়েক বছরের বিস্তারিত পূর্বাভাসের পরে বাকি সব বছরের মূল্য, সাধারণত একটা স্থির বৃদ্ধির সূত্রে: পরের বছরের নগদ প্রবাহ ÷ (ডিসকাউন্ট রেট − বৃদ্ধির হার)।
- ৪. সব আজকের মূল্যে এনে যোগ করা। পুরো কোম্পানির নগদ প্রবাহ নিয়ে হিসাব করলে শেষে দেনা বাদ দিয়ে শেয়ারের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করতে হয়।
"গারবেজ ইন, গারবেজ আউট"
ডিসিএফ-এর উত্তর ঠিক ততটাই ভালো, যতটা ভালো তার অনুমান। ডিসকাউন্ট রেট বা বৃদ্ধির হারে এক-দুই শতাংশ বিন্দুর পরিবর্তনেই মূল্য অনেকখানি বদলে যেতে পারে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোট মূল্যের বড় অংশ আসে টার্মিনাল ভ্যালু থেকে, মানে সবচেয়ে দূরের, সবচেয়ে অনিশ্চিত বছরগুলো থেকে।
তাই অভিজ্ঞ বিশ্লেষকেরা একটা সংখ্যা নয়, কয়েকটা দৃশ্যপট (হতাশাবাদী, মাঝামাঝি, আশাবাদী) বানিয়ে একটা পরিসর দেখেন। বৃদ্ধির হার কখনো ডিসকাউন্ট রেটের সমান বা বেশি ধরা যায় না; তাহলে সূত্রটাই অর্থহীন হয়ে যায়।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক "রূপসা ফুডস লিমিটেড" নামের একটা কাল্পনিক কোম্পানির শেয়ারপ্রতি ফ্রি ক্যাশ ফ্লো আগামী তিন বছর প্রতি বছর ৫ টাকা। ডিসকাউন্ট রেট ১২%।
- আজকের মূল্য: ৫ ÷ ১.১২ = ৪.৪৬; ৫ ÷ ১.১২² = ৩.৯৯; ৫ ÷ ১.১২³ = ৩.৫৬। তিন বছরের মোট ≈ ১২.০১ টাকা।
- তিন বছর পরে নগদ প্রবাহ প্রতি বছর ৪% করে বাড়বে ধরলে, টার্মিনাল ভ্যালু = (৫ × ১.০৪) ÷ (০.১২ − ০.০৪) = ৬৫ টাকা। আজকের মূল্যে: ৬৫ ÷ ১.১২³ ≈ ৪৬.২৭ টাকা।
- মোট মূল্য ≈ ১২.০১ + ৪৬.২৭ = ৫৮.২৮ টাকা, যার প্রায় ৭৯% এসেছে টার্মিনাল ভ্যালু থেকে।
- এবার একটা করে অনুমান বদলান: ডিসকাউন্ট রেট ১৪% হলে মূল্য ≈ ৪৬.৭১ টাকা; রেট ১২% রেখে বৃদ্ধি ৬% হলে ≈ ৭৪.৮৮ টাকা।
ফল: ছোট দুটো অনুমানের বদলেই মূল্য ৪৭ থেকে ৭৫ টাকার মধ্যে ঘুরে গেল। ডিসিএফ চিন্তা গোছাতে দারুণ, কিন্তু এর উত্তরকে একটা পরিসর হিসেবেই দেখুন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| প্রথম তিন বছরের ক্যাশ ফ্লো | টার্মিনাল ভ্যালু | |
|---|---|---|
| আজকের মূল্যে | ১২ | ৪৬ |
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- দশমিকের পরে দুই ঘর পর্যন্ত হিসাব দেখে উত্তরটাকে নিখুঁত ভাবা।
- নিট মুনাফাকেই নগদ প্রবাহ ধরে নেওয়া, ব্যবসার দরকারি বিনিয়োগ বাদ না দেওয়া।
- বছরের পর বছর খুব উঁচু বৃদ্ধির হার ধরা, বা বৃদ্ধির হার ডিসকাউন্ট রেটের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া।
- কাঙ্ক্ষিত উত্তর মাথায় রেখে সেই অনুযায়ী অনুমান সাজানো।
ডিসিএফ মানে ভবিষ্যতের প্রতিটা টাকাকে আজকের টাকায় এনে যোগ করা। সূত্রটা সহজ; উত্তরের মান পুরোপুরি নির্ভর করে আপনার অনুমানের সততার ওপর।