BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

পঞ্জি স্কিম

যে "ইনভেস্টমেন্ট" পুরোনো ইনভেস্টরদের মুনাফা দেয় নতুন ইনভেস্টরদের টাকা থেকে, কোনো আসল ব্যবসার আয় থেকে নয়। শুরুতে নিখুঁত মনে হয়, কিন্তু গাণিতিকভাবেই একদিন ভেঙে পড়ে।

ভিডিও আসছে
পঞ্জি স্কিম: নতুনের টাকায় পুরোনোকে "মুনাফা"

পঞ্জি স্কিম কী

পঞ্জি স্কিম একটা ইনভেস্টমেন্ট প্রতারণা। আয়োজকেরা বলেন, আপনার টাকা কোনো লাভজনক ব্যবসায় খাটানো হচ্ছে: আমদানি, জমি, খামার, ক্রিপ্টো, "এআই ট্রেডিং", যা-ই হোক। বাস্তবে কোনো ব্যবসা থাকে না, অথবা থাকলেও তা থেকে প্রতিশ্রুত মুনাফা আসে না। পুরোনো ইনভেস্টরদের যে "মুনাফা" দেওয়া হয়, তা আসলে নতুন ইনভেস্টরদের জমা দেওয়া টাকা।

নামটা এসেছে চার্লস পঞ্জির নাম থেকে। ১৯১৯–২০ সালে আমেরিকার বোস্টনে তিনি ৪৫ দিনে ৫০% লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাজারো মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলেন। গল্প ছিল ডাকটিকিটের কুপন কেনাবেচা; আসলে পুরোনোদের টাকা দেওয়া হচ্ছিল নতুনদের টাকায়। ১৯২০ সালের আগস্টে স্কিমটা ভেঙে পড়ে।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক পাড়ার এক পরিচিত ভাই বললেন, "আমার কাছে ৫০,০০০ টাকা রাখো, প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা লাভ দেব।" রফিক রাখলেন, আর সত্যিই তিন মাস ঠিকঠাক ৫,০০০ টাকা করে পেলেন। খুশি হয়ে তিনি ভাই-বোন আর অফিসের সহকর্মীদেরও আনলেন। রফিক জানেন না, তাঁর লাভের টাকা এসেছে ওই নতুন মানুষদের জমা থেকেই। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • নিয়মিত টাকা পাওয়া মানেই আসল ব্যবসা নয়: পঞ্জি স্কিম শুরুতে ঠিকঠাক টাকা দেয়, কারণ আস্থা তৈরিই তার কৌশল।
  • শেষে আসা মানুষেরা সবচেয়ে বেশি হারান: স্কিম ভাঙলে যাঁরা দেরিতে ঢুকেছেন, তাঁরা সাধারণত মূল টাকাও ফেরত পান না।
  • ক্ষতি শুধু টাকার নয়: পরিচিতজনদের মাধ্যমে ছড়ায় বলে পরিবার আর বন্ধুত্বের সম্পর্কও নষ্ট হয়।
  • আগে থেকে চিনতে পারলে বাঁচা সহজ: স্কিম ভাঙার পরে টাকা ফেরত পাওয়া খুব কঠিন, তাই আসল সুরক্ষা হলো ঢোকার আগেই চেনা।

কেন একদিন ভেঙে পড়তেই হয়

পঞ্জি স্কিমের নিজের কোনো আয় নেই, তাই প্রতি মাসের প্রতিশ্রুত মুনাফা মেটাতে প্রতি মাসেই নতুন টাকা লাগে। যত বেশি মানুষ ঢোকে, তত বেশি মানুষকে মুনাফা দিতে হয়, ফলে আরও বেশি নতুন টাকা লাগে। কোনো দেশে বা শহরে মানুষের সংখ্যা সীমিত, তাই একসময় নতুন টাকার স্রোত কমে আসে।

তখন দুটো জিনিস একসঙ্গে ঘটে: নতুন টাকা কমে, আর গুজব ছড়ালে পুরোনোরা একসঙ্গে টাকা তুলতে চান। আয়োজকেরা প্রথমে "সার্ভার সমস্যা" বা "নতুন নিয়ম" বলে দেরি করান, তারপর অফিস বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় আয়োজকেরা আগে থেকেই টাকার বড় অংশ সরিয়ে রাখেন।

বিখ্যাত ঘটনা আর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা

সবচেয়ে বড় পরিচিত উদাহরণ বার্নার্ড ম্যাডফ। তিনি আমেরিকায় বহু বছর ধরে নিয়মিত, "অস্বাভাবিক স্থির" রিটার্ন দেখিয়ে ইনভেস্টরদের টাকা নেন; কাগজে-কলমে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি ডলার বলে ধরা হয়। ২০০৯ সালে তাঁর ১৫০ বছরের কারাদণ্ড হয়। অর্থাৎ শিক্ষিত, ধনী ইনভেস্টররাও পঞ্জি স্কিমে ঠকেন।

বাংলাদেশে এর রূপ বদলেছে, কিন্তু ধরন একই। ২০০০-এর দশকে এমএলএম আর আমানত নেওয়া সমিতি, পরে ২০২১ সালে বিপুল ছাড়ের কিছু ই-কমার্স স্কিম। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক মূল্যায়নে ২৫টি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম চিহ্নিত হয়, যাদের মাধ্যমে মার্চ–জুন ২০২১, এই চার মাসে প্রায় ৬,০৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল; আগে পাওয়া টাকায় পুরোনো অর্ডার মেটানো হচ্ছিল, আর বহু গ্রাহক পণ্য বা টাকা কোনোটাই পাননি।

চেনার লক্ষণ

  • বেশি মুনাফা, অথচ "কোনো ঝুঁকি নেই" বলা। বাস্তবে বেশি রিটার্ন মানেই বেশি রিস্ক।
  • বাজার ওঠানামা করলেও মাসের পর মাস একই রকম স্থির মুনাফা।
  • টাকা কোথায় খাটছে তার ব্যাখ্যা অস্পষ্ট বা "গোপন কৌশল"; কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার লাইসেন্স নেই।
  • টাকা তুলতে গেলে দেরি, অজুহাত, বা "আরও কিছুদিন রাখলে বেশি দেব" প্রস্তাব।

হাতে-কলমে হিসাব

পঞ্জির হিসাব (কাল্পনিক উদাহরণ)
  1. ধরা যাক একটা স্কিম ১০০ জনের কাছ থেকে ১০,০০০ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা নিল। প্রতিশ্রুতি: মাসে ১০% মুনাফা। কোনো আসল ব্যবসা নেই।
  2. প্রতি মাসে মুনাফা দিতে লাগে ১ লাখ টাকা। ১০ মাসেই জমা হওয়া পুরো ১০ লাখ টাকা শুধু "মুনাফা" দিতে শেষ।
  3. কিন্তু ১০০ জনের মূল ১০ লাখ টাকা এখনও পাওনা। এই টাকা আসতে পারে শুধু নতুন সদস্যদের কাছ থেকে, আর নতুনদেরও তো ১০% করে দিতে হবে।

ফল: দায় প্রতি মাসে বাড়তেই থাকে, তাই টিকে থাকতে প্রতিনিয়ত আরও বেশি নতুন টাকা লাগে। নতুন টাকা কমলেই স্কিম ভেঙে পড়ে, আর শেষে যাঁরা ঢোকেন তাঁরাই সবচেয়ে বেশি হারান। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • "আমি তো তিন মাস ধরে টাকা পাচ্ছি, তাই এটা আসল" ভাবা। শুরুতে টাকা দেওয়াই পঞ্জির কৌশল।
  • "আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাব" ভেবে ঢোকা। কখন ভাঙবে কেউ জানে না, আর তখন সবাই একসঙ্গে বেরোতে চায়।
  • পরিচিত বা সম্মানিত মানুষ আছেন বলে যাচাই না করা। তাঁরাও হয়তো না বুঝেই ঢুকেছেন।
  • লাভের টাকা আবার স্কিমেই রেখে দেওয়া, ফলে ঝুঁকিতে থাকা টাকার অঙ্ক বাড়তে থাকে।
মনে রাখুন

মুনাফা কোন আসল আয় থেকে আসছে, সেটা ব্যাখ্যা আর যাচাই করা না গেলে ধরে নিন সেটা হয়তো অন্য কারও জমা টাকা।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
সংজ্ঞা ও লক্ষণ: ইউএস এসইসি, Investor.gov, "Ponzi Scheme", দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
চার্লস পঞ্জি, ৪৫ দিনে ৫০%, আগস্ট ১৯২০-এ পতন: হিস্ট্রি ডট কম, "How Did the Ponzi Scheme Get Its Name?", দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
ম্যাডফের ১৫০ বছরের কারাদণ্ড ও প্রতারণার আকার: পিবিএস নিউজআওয়ার, "Madoff Sentenced to 150 Years in Prison for Ponzi Scheme", ২৯ জুন ২০০৯ ↗
২৫টি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, মার্চ–জুন ২০২১-এ ৬,০৫০ কোটি টাকা (বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন): দ্য ডেইলি স্টার, "Ponzi schemes brought them Tk 6,050cr in just 4 months", ১৬ মার্চ ২০২২ ↗
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।