ইটিএফ কী
ইটিএফ মিউচুয়াল ফান্ডের মতোই অনেক মানুষের টাকা একসঙ্গে করে শেয়ার, বন্ড বা অন্য সম্পদে বিনিয়োগ করে। পার্থক্য হলো কেনাবেচার জায়গায়। ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কেনা-ফেরত হয় সম্পদ ব্যবস্থাপকের কাছে, দিনের শেষে হিসাব করা এনএভি ধরে। ইটিএফের ইউনিট কেনাবেচা হয় স্টক এক্সচেঞ্জে, বিও অ্যাকাউন্ট আর ব্রোকারের মাধ্যমে, বাজার চলার সময় যেকোনো মুহূর্তে, তখনকার বাজারদরে।
বেশিরভাগ ইটিএফ কোনো একটা সূচক অনুসরণ করে, তবে সব নয়। কিছু ইটিএফ অ্যাকটিভলি ম্যানেজড: ম্যানেজার নিজে বাছাই করেন, শুধু কাঠামোটা ইটিএফের। তাই "ইটিএফ" শব্দটা বলে ফান্ড কীভাবে কেনাবেচা হয়, ফান্ড ভেতরে কী রাখে তা নয়।
ধরা যাক বাজারে ফলের একটা মিশ্র ঝুড়ি বিক্রি হয়, যাতে আম, কলা, পেয়ারা নির্দিষ্ট অনুপাতে আছে। আপনি আলাদা করে প্রতিটা ফল দরদাম করে কিনছেন না, পুরো ঝুড়িটা এক দামে কিনছেন। আর ঝুড়িটা দোকান থেকে দোকানে হাতবদল হয়, দাম ঠিক হয় ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষিতে। ইটিএফ হলো স্টক এক্সচেঞ্জে কেনাবেচা হওয়া এমন একটা ঝুড়ি।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- এক লেনদেনে অনেক কোম্পানি: একটা ইউনিট কিনলেই ফান্ডের সব সম্পদের ছোট ভাগ পাওয়া যায়, আলাদা আলাদা শেয়ার কিনতে হয় না।
- দাম আর মূল্য আলাদা হতে পারে: বাজারদর ফান্ডের আসল মূল্যের (এনএভি) চেয়ে একটু বেশি বা কম হতে পারে। কত দিয়ে কিনছেন, সেটা দেখা জরুরি।
- খরচ দুই জায়গায়: ফান্ডের বার্ষিক খরচের সঙ্গে শেয়ার কেনাবেচার মতো ব্রোকারেজ কমিশন আর স্প্রেডও লাগে।
- ঝুঁকি ভেতরের সম্পদের: শেয়ারের ইটিএফ শেয়ারবাজারের মতোই ওঠানামা করে। কাঠামো আধুনিক হলেই ঝুঁকি কমে না।
বাজারদর কেন এনএভির কাছাকাছি থাকে
ক্লোজড-এন্ড ফান্ডও এক্সচেঞ্জে কেনাবেচা হয়, কিন্তু তার ইউনিটের সংখ্যা নির্দিষ্ট। তাই চাহিদা কম হলে দাম এনএভির অনেক নিচে নেমে যেতে পারে। ইটিএফে একটা বাড়তি ব্যবস্থা আছে: কিছু অনুমোদিত বড় প্রতিষ্ঠান (অথরাইজড পার্টিসিপ্যান্ট) ফান্ডের কাছে শেয়ারের একটা ঝুড়ি দিয়ে নতুন ইউনিট বানিয়ে নিতে পারে, আবার ইউনিট ফেরত দিয়ে ঝুড়িটা ফিরিয়ে নিতে পারে।
ইটিএফের দাম এনএভির চেয়ে বেশি হলে তারা ঝুড়ি কিনে নতুন ইউনিট বানিয়ে বাজারে বেচে; বাড়তি জোগানে দাম নামে। দাম কম হলে তারা সস্তায় ইউনিট কিনে ফান্ডকে ফেরত দেয়; জোগান কমে, দাম ওঠে। এই লাভের সুযোগই দামকে এনএভির কাছে টেনে রাখে। তবে কম লেনদেন হওয়া বাজারে বা অস্থির সময়ে পার্থক্য বড়ও হতে পারে।
বাংলাদেশে ইটিএফ
বাংলাদেশে ইটিএফের বিধিমালা হয় ২০১৭ সালে। ২০২২ সালে ডিএসই জানায়, প্রধানত ডিএস৩০ সূচকে বিনিয়োগ করা ইটিএফ আনার নীতিগত সম্মতি বিএসইসি দিয়েছে, ন্যূনতম ফান্ডের আকার ৫০ কোটি টাকা ধরে। ২০২৩ সালে দেশের প্রথম ইটিএফ অনুমোদন পায়, তবে সেটা সূচক অনুসরণ করা নয়, অ্যাকটিভলি ম্যানেজড।
জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত সেই ইটিএফ যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম টাকা তুলতে পারেনি, তাই সাবস্ক্রিপশনের সময় কয়েকবার বাড়াতে হয়। কারণ হিসেবে বলা হয় নতুন পণ্য সম্পর্কে কম ধারণা, দুর্বল শেয়ারবাজার আর ট্রেজারি বন্ড ও এফডিআরের বেশি সুদ। নতুন কোনো ইটিএফ এলে বিএসইসি আর স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ তথ্য দেখে নিন।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা ইটিএফের এনএভি ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা, কিন্তু বাজারে বিক্রেতারা চাইছেন ১০.৩০ টাকা। ১০,০০০ ইউনিট কিনতে লাগল ১,০৩,০০০ টাকা, অথচ ভেতরের সম্পদের মূল্য ১,০০,০০০ টাকা। আপনি ৩% প্রিমিয়াম দিলেন।
- একই সময়ে ক্রেতারা দিচ্ছেন ১০.২০ টাকা। কিনেই সঙ্গে সঙ্গে বেচলে পাবেন ১,০২,০০০ টাকা। এই ১০ পয়সার পার্থক্যই স্প্রেড: ১,০০০ টাকা চলে গেল, ব্রোকারেজ কমিশন ছাড়াই।
- পরে প্রিমিয়াম মিলিয়ে গেলে, এনএভি না বাড়লেও ইউনিটের দাম ১০ টাকার কাছে নেমে আসতে পারে।
ফল: ইটিএফে কেনার সময় শুধু ফান্ডের খরচ নয়, বাজারদর আর এনএভির পার্থক্য আর ক্রয়-বিক্রয় দামের ফাঁকও দেখতে হয়। কম লেনদেন হওয়া ইটিএফে এই ফাঁক সাধারণত বড় হয়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ধরে নেওয়া যে সব ইটিএফ সূচক অনুসরণ করে। কিছু ইটিএফ অ্যাকটিভলি ম্যানেজড।
- শেয়ারের মতো কেনাবেচা করা যায় বলে ঘন ঘন কেনাবেচা করা। প্রতিবার ব্রোকারেজ আর স্প্রেডের খরচ লাগে।
- বাজারদর আর এনএভি এক ভাবা। দাম এনএভির চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে।
- "ইটিএফ" নাম শুনে নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ ভাবা। ঝুঁকি নির্ভর করে ফান্ড ভেতরে কী রাখে, তার ওপর।
ইটিএফ হলো শেয়ারের মতো কেনাবেচা হওয়া একটা ফান্ড: ভেতরে কী আছে দেখুন, আর কেনার সময় দাম, এনএভি আর স্প্রেড মিলিয়ে নিন।