প্রাইস-টু-বুক কী
কোম্পানির সব সম্পদ থেকে সব দায় (ঋণ, পাওনাদারের টাকা ইত্যাদি) বাদ দিলে যা থাকে, সেটা শেয়ারহোল্ডারদের ভাগ। একে বলে শেয়ারহোল্ডারস ইকুইটি, নিট সম্পদ বা বুক ভ্যালু। একে মোট শেয়ারের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় শেয়ারপ্রতি বুক ভ্যালু, যাকে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিবেদনে সাধারণত "শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য" বা NAV per share বলা হয়।
পি/বি রেশিও = শেয়ারের বাজারদাম ÷ শেয়ারপ্রতি বুক ভ্যালু। পি/বি ২ মানে, খাতায় শেয়ারপ্রতি যত টাকার নিট সম্পদ আছে, বাজার তার দ্বিগুণ দাম দিচ্ছে। পি/বি ০.৮ মানে বাজারদাম খাতার মূল্যের চেয়েও কম।
ধরা যাক রফিক সাহেবের একটা মুদি দোকান। দোকানের মালপত্র, ফ্রিজ আর ক্যাশ মিলিয়ে সম্পদ ১০ লাখ টাকা, পাইকারের কাছে বাকি ৪ লাখ। খাতার হিসাবে দোকানের নিট মূল্য ৬ লাখ। কেউ যদি পুরো দোকান ৯ লাখে কিনতে চান, তিনি খাতার মূল্যের দেড় গুণ (পি/বি ১.৫) দিচ্ছেন, কারণ তিনি ভাবছেন দোকানের নিয়মিত খদ্দের আর জায়গার একটা দাম আছে, যা খাতায় লেখা নেই। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- দামের সঙ্গে সম্পদের তুলনা করতে: শেয়ারের দাম কোম্পানির নিট সম্পদের তুলনায় কতটা বেশি বা কম, তা এক নজরে দেখা যায়।
- লোকসানি কোম্পানির ক্ষেত্রেও কাজে লাগে: মুনাফা না থাকলে পি/ই হিসাব করা যায় না, কিন্তু বুক ভ্যালু ধনাত্মক থাকলে পি/বি হিসাব করা যায়।
- বাজারের প্রত্যাশা বুঝতে: পি/বি বেশি মানে সাধারণত বাজার আশা করছে কোম্পানি তার নিট সম্পদ থেকে ভালো মুনাফা করবে। এর সঙ্গে রিটার্ন অন ইকুইটির (ROE) সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।
- ফেস ভ্যালু, বুক ভ্যালু আর বাজারদাম আলাদা করতে: বাংলাদেশে শেয়ারের ফেস ভ্যালু সাধারণত ১০ টাকা, কিন্তু বুক ভ্যালু আর বাজারদাম তার থেকে অনেক আলাদা হতে পারে।
বুক ভ্যালু কী ধরে, কী ধরে না
বুক ভ্যালু হিসাবের নিয়মে লেখা মূল্য, বাজারে বেচলে কত পাওয়া যাবে তা নয়। জমি, ভবন বা মেশিন অনেক সময় বহু বছর আগের কেনা দামে (অবচয় বাদ দিয়ে) লেখা থাকে। আবার যে পণ্য আর বিক্রি হবে না, বা যে পাওনা আর আদায় হবে না, সেগুলোও সময়মতো বাদ না দিলে খাতায় সম্পদ হিসেবে থেকে যেতে পারে।
যেসব জিনিস একটা ব্যবসার আসল শক্তি, তার অনেকটাই খাতায় থাকে না: ব্র্যান্ডের নাম, দক্ষ কর্মী, গ্রাহকের আস্থা, নিজের তৈরি সফটওয়্যার। তাই এমন কোম্পানির পি/বি স্বাভাবিকভাবেই বেশি দেখাতে পারে।
কোথায় বেশি কাজে লাগে, কোথায় কম
- বেশি কাজে লাগে যেখানে সম্পদ মূলত আর্থিক বা বাস্তব, আর তার মূল্য মোটামুটি মাপা যায়: যেমন ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি, ইনস্যুরেন্স বা সম্পদনির্ভর ব্যবসা। তবে এখানেও ঋণের মান খারাপ হলে খাতার সম্পদ আসলের চেয়ে বেশি দেখাতে পারে।
- কম কাজে লাগে সেবা, ব্র্যান্ড বা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়, যেখানে আসল মূল্য খাতার বাইরে।
- এক খাতের কোম্পানির পি/বি অন্য খাতের সঙ্গে তুলনা করলে বিভ্রান্তি হয়। তুলনা করুন একই ধরনের ব্যবসার মধ্যে, আর একই কোম্পানির নিজের অতীতের সঙ্গে।
১-এর নিচে পি/বি মানে কী
পি/বি ১-এর নিচে মানে বাজার খাতার মূল্যের চেয়েও কম দাম দিচ্ছে। এর পেছনে দুই রকম কারণ থাকতে পারে: হয় বাজার কোম্পানিকে অবমূল্যায়ন করছে, নয়তো বাজার মনে করছে খাতার সম্পদ আসলে এত মূল্যবান নয়, বা কোম্পানি সেই সম্পদ থেকে প্রায় কিছুই আয় করতে পারছে না। কোনটা সত্যি, তা পি/বি একা বলে না; বুঝতে হলে ব্যালান্স শিট, মুনাফার ইতিহাস আর ROE দেখতে হয়।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক "রূপসা ফুডস লিমিটেড" নামের একটা কাল্পনিক কোম্পানির মোট সম্পদ ৫০০ কোটি টাকা, মোট দায় ৩০০ কোটি টাকা। বুক ভ্যালু = ৫০০ − ৩০০ = ২০০ কোটি টাকা।
- শেয়ার আছে ১০ কোটি, প্রতিটির ফেস ভ্যালু ১০ টাকা। শেয়ারপ্রতি বুক ভ্যালু = ২০০ কোটি ÷ ১০ কোটি = ২০ টাকা।
- শেয়ারের বাজারদাম ৩০ টাকা হলে পি/বি = ৩০ ÷ ২০ = ১.৫। দাম ১৬ টাকায় নামলে পি/বি = ০.৮।
ফল: একই শেয়ারের তিনটা আলাদা "মূল্য": ফেস ভ্যালু ১০ টাকা, বুক ভ্যালু ২০ টাকা, বাজারদাম ৩০ বা ১৬ টাকা। পি/বি ০.৮ সস্তা না বিপদের সংকেত, তা জানতে দেখতে হবে সম্পদগুলো আসলে কতটা মূল্যবান আর সেগুলো থেকে কত আয় হচ্ছে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- পি/বি ১-এর নিচে মানেই সস্তা ভাবা। অনেক সময় দাম কম, কারণ সম্পদের মান বা আয় দুর্বল।
- বুক ভ্যালুকে বিক্রয়মূল্য ভাবা। খাতার মূল্য আর বাজারে বেচার দাম এক নয়।
- ফেস ভ্যালু, বুক ভ্যালু আর বাজারদাম গুলিয়ে ফেলা।
- ভিন্ন খাতের কোম্পানির পি/বি পাশাপাশি রেখে তুলনা করা।
পি/বি বলে বাজার খাতার নিট সম্পদের কত গুণ দাম দিচ্ছে; কিন্তু খাতার মূল্য কতটা খাঁটি আর তা থেকে কত আয় হয়, না দেখে পি/বি দিয়ে সস্তা-দামি বিচার করা যায় না।