ব্যালান্স শিট কী
ব্যালান্স শিট (আইএফআরএস-এর ভাষায় "স্টেটমেন্ট অব ফাইন্যান্সিয়াল পজিশন") কোম্পানির একটা দিনের ছবি, সাধারণত হিসাব-বছরের শেষ দিন, যেমন ৩০ জুন। এর তিনটা অংশ: অ্যাসেট (কোম্পানির যা আছে), লায়াবিলিটি (যা দেনা), আর ইকুইটি (দেনা বাদে শেয়ারহোল্ডারদের যা থাকে)।
এর মূল সমীকরণ: অ্যাসেট = লায়াবিলিটি + ইকুইটি। কোম্পানির প্রতিটি সম্পদ কেনার টাকা এসেছে হয় কারও কাছ থেকে ধার করে, নয়তো মালিকদের টাকা (আর জমানো লাভ) থেকে। তাই দুই দিক সব সময় সমান, এজন্যই নাম "ব্যালান্স" শিট।
ধরা যাক করিম সাহেবের একটা ফ্ল্যাট আছে যার বাজারমূল্য ৮০ লাখ টাকা, আর ব্যাংকে জমা ১০ লাখ। মোট সম্পদ ৯০ লাখ। ফ্ল্যাটের হোম লোনের বাকি আছে ৫০ লাখ। তাহলে তাঁর নিজের আসল সম্পদ বা "ইকুইটি" ৪০ লাখ টাকা। ৯০ = ৫০ + ৪০, এটাই তাঁর ব্যক্তিগত ব্যালান্স শিট। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- কোম্পানি কতটা দেনার ওপর চলছে বোঝা যায়। খারাপ সময়ে বেশি দেনার কোম্পানি আগে বিপদে পড়ে, কারণ লাভ না হলেও ইন্টারেস্ট আর কিস্তি দিতে হয়।
- সামনের এক বছরের দেনা মেটানোর মতো নগদ আর সহজে নগদ করা যায় এমন সম্পদ আছে কি না, সেটা দেখা যায়।
- শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ (এনএভি) আর পি/বি, আরওই, ডেট-টু-ইকুইটির মতো রেশিওগুলো এখানকার সংখ্যা দিয়েই হিসাব হয়।
- ইনকাম স্টেটমেন্টের লাভ ঠিক আছে কি না যাচাইয়ে সাহায্য করে: লাভ বাড়ছে অথচ পাওনা টাকা (রিসিভেবল) আর মজুত আরও দ্রুত বাড়ছে, এমন হলে প্রশ্ন জাগে।
তিনটা অংশ ভালো করে
- নন-কারেন্ট অ্যাসেট: যা এক বছরের বেশি সময় ব্যবহার হবে, যেমন জমি, কারখানা, যন্ত্রপাতি, অন্য কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদি ইনভেস্টমেন্ট। যন্ত্রপাতির দাম প্রতি বছর ডেপ্রিসিয়েশন হিসেবে কিছুটা করে কমানো হয়।
- কারেন্ট অ্যাসেট: এক বছরের মধ্যে নগদে রূপ নেবে বলে ধরা হয়, যেমন মজুত পণ্য (ইনভেন্টরি), ক্রেতাদের কাছে পাওনা (রিসিভেবল), আর নগদ ও ব্যাংক জমা।
- লায়াবিলিটি: দীর্ঘমেয়াদি লোন (নন-কারেন্ট), আর এক বছরের মধ্যে শোধ করতে হবে এমন দেনা (কারেন্ট), যেমন সরবরাহকারীর পাওনা, স্বল্পমেয়াদি লোন, বকেয়া ট্যাক্স।
- ইকুইটি: শেয়ার মূলধন (পেইড-আপ ক্যাপিটাল), আর বছরের পর বছর ডিভিডেন্ড দেওয়ার পর জমে থাকা লাভ (রিটেইনড আর্নিংস), সঙ্গে কিছু রিজার্ভ।
এনএভি: শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ
মোট ইকুইটিকে শেয়ার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ বা এনএভি পার শেয়ার (বুক ভ্যালু পার শেয়ারও বলে)। বাংলাদেশে বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো কোয়ার্টারলি হিসাবে ইপিএসের পাশাপাশি এনএভি পার শেয়ার আর শেয়ারপ্রতি নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো (এনওসিএফপিএস), আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করে প্রকাশ করে।
তবে এনএভি হলো হিসাবের খাতার মূল্য, বাজারে বিক্রি করলে যা পাওয়া যাবে তা নয়। পুরোনো দামে কেনা জমির আসল মূল্য অনেক বেশি হতে পারে, আবার অচল যন্ত্র বা আদায় হবে না এমন পাওনার মূল্য খাতার চেয়ে অনেক কম হতে পারে। ব্র্যান্ড বা দক্ষ কর্মীর মতো জিনিস সাধারণত খাতায় থাকেই না।
কোন জায়গায় চোখ রাখবেন
- কারেন্ট অ্যাসেট বনাম কারেন্ট লায়াবিলিটি: এক বছরের দেনা যদি এক বছরে নগদ হবে এমন সম্পদের চেয়ে বেশি হয়, কোম্পানিকে নতুন ধার বা সম্পদ বিক্রির ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
- রিসিভেবল আর ইনভেন্টরির হঠাৎ বৃদ্ধি: বিক্রির চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়লে হয় টাকা আদায় হচ্ছে না, নয়তো মাল বিক্রি হচ্ছে না।
- বছরে বছরে দেনার ধারা: লোন বাড়ছে কিন্তু লাভ বাড়ছে না, এমন হলে কারণ খুঁজুন নোটে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক কাল্পনিক "রূপসা ফুডস লিমিটেড"-এর ৩০ জুনে কারখানা ও যন্ত্রপাতি ৪০০ কোটি টাকা, মজুত ৮০ কোটি, পাওনা ৬০ কোটি, নগদ ৪০ কোটি। মোট অ্যাসেট ৫৮০ কোটি।
- দেনা: দীর্ঘমেয়াদি লোন ১৫০ কোটি, এক বছরের মধ্যে শোধযোগ্য লোন ৬০ কোটি, সরবরাহকারীর পাওনা ৫০ কোটি। মোট লায়াবিলিটি ২৬০ কোটি।
- ইকুইটি = ৫৮০ − ২৬০ = ৩২০ কোটি (শেয়ার মূলধন ১০০ কোটি + জমানো লাভ ২২০ কোটি)। শেয়ার সংখ্যা ১০ কোটি।
ফল: এনএভি পার শেয়ার = ৩২০ কোটি ÷ ১০ কোটি = ৩২ টাকা। কারেন্ট অ্যাসেট ১৮০ কোটি, কারেন্ট লায়াবিলিটি ১১০ কোটি: এক বছরের দেনার চেয়ে এক বছরে নগদ হবে এমন সম্পদ বেশি। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- এনএভিকে কোম্পানির "আসল দাম" ভাবা। এটা হিসাবের খাতার মূল্য, বিক্রয়মূল্য বা ব্যবসার মূল্য নয়।
- শুধু মোট অ্যাসেট দেখে কোম্পানিকে বড় ও মজবুত ভাবা, অথচ তার বড় অংশ দেনার টাকায় কেনা।
- একটা বছরের ব্যালান্স শিট দেখা। দেনা, পাওনা আর মজুত কোন দিকে যাচ্ছে, তা কয়েক বছর পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়।
- নোট না পড়া। কোন সম্পদ বন্ধক রাখা, কোন মামলা বা গ্যারান্টি আছে, এসব প্রায়ই নোটে থাকে।
ব্যালান্স শিট বলে কোম্পানির পায়ের নিচে মাটি কতটা শক্ত: কী আছে, কী দেনা, আর সব দেনা মিটিয়ে আপনার ভাগে কত থাকে।