ইনডেক্স কী
বাজারে শত শত শেয়ার। কোনো দিন কিছুর দাম বাড়ে, কিছুর কমে। সবগুলো আলাদা করে দেখে "আজ বাজার কেমন গেল" বলা কঠিন। স্টক ইনডেক্স বা সূচক এই কাজটা সহজ করে: বাছাই করা অনেকগুলো শেয়ারের দাম একটা নিয়মে মিলিয়ে একটা সংখ্যা বানায়। সংখ্যাটা বাড়লে বোঝা যায়, ওই শেয়ারগুলো মিলিয়ে দাম বেড়েছে।
সূচকের সংখ্যাটার নিজের কোনো টাকার মূল্য নেই। শুরুর দিনে একটা ভিত্তি সংখ্যা (যেমন ১,০০০) ধরে নেওয়া হয়, তারপর সেখান থেকে কত শতাংশ ওঠানামা হলো, সেটাই আসল তথ্য। তাই "১০০ পয়েন্ট বেড়েছে" শোনার চেয়ে "কত শতাংশ বেড়েছে" জানা বেশি কাজের।
বাজারের ইনফ্লেশন যেভাবে মাপা হয়, একটা "ঝুড়ি" ধরে, সূচকও তেমন। ধরা যাক আপনি প্রতি সপ্তাহে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ আর ডিমের দাম লিখে রাখেন আর সব মিলিয়ে একটা সংখ্যা বানান। কোনো সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম অনেক বাড়লেও ডিম কমলে মোট সংখ্যা হয়তো সামান্যই বাড়ল। শেয়ারের সূচকে জিনিসপত্রের বদলে থাকে কোম্পানির শেয়ার। উদাহরণটা শুধু বোঝার জন্য।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- বাজারের তাপমাত্রা বুঝতে: সূচক দেখে বোঝা যায় বাজার সাধারণভাবে চাঙা না মন্দা, আলাদা আলাদা শেয়ার না দেখেই।
- নিজের ফল তুলনা করতে: আপনার শেয়ার বা ফান্ড বছরে ৫% বাড়ল; একই সময়ে সূচক ১৫% বাড়লে আসলে আপনি বাজারের পেছনে। সূচক এখানে মাপকাঠি বা বেঞ্চমার্ক।
- ইনডেক্স ফান্ড বুঝতে: ইনডেক্স ফান্ড আর অনেক ইটিএফ একটা সূচককে হুবহু অনুসরণ করে। সূচক কীভাবে বানানো, তা না জানলে ফান্ডটা কী কিনছে বোঝা যায় না।
- খবর ঠিকমতো পড়তে: সূচক বাড়লেও বেশিরভাগ শেয়ার কমতে পারে, যদি অল্প কয়েকটা বড় কোম্পানির দাম অনেক বাড়ে।
কীভাবে হিসাব হয়: ওজনই আসল কথা
সূচকে প্রতিটা শেয়ারের "ওজন" কত হবে, সেটাই মূল প্রশ্ন। সবচেয়ে পুরোনো পদ্ধতি প্রাইস-ওয়েটেড: যে শেয়ারের দাম বেশি, তার ওজন বেশি। আমেরিকার ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ এভাবেই চলে; এটা প্রথম প্রকাশ হয় ২৬ মে ১৮৯৬, মাত্র ১২টা কোম্পানি নিয়ে, ১৯২৮ থেকে ৩০টা। এখন বেশিরভাগ বড় সূচক মার্কেট-ক্যাপ-ওয়েটেড: যে কোম্পানির মোট বাজারমূল্য বেশি, তার ওজন বেশি।
আরও এক ধাপ হলো ফ্রি-ফ্লোট: উদ্যোক্তা, সরকার বা কৌশলগত মালিকদের হাতে থাকা যে শেয়ার সাধারণত বাজারে কেনাবেচা হয় না, সেগুলো বাদ দিয়ে শুধু বাজারে চলাচল করা শেয়ার ধরে ওজন হিসাব। ডিএসইর পুরোনো সাধারণ সূচক ডিজেন সব শেয়ার ধরত। ২০০৯ সালে একটা খুব বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে এক দিনে সেই সূচক ৭৬৪ পয়েন্টের বেশি লাফিয়ে ওঠে, যা বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি করে। এর পরেই ফ্রি-ফ্লোট পদ্ধতির নতুন সূচক আসে।
বাংলাদেশের প্রধান সূচকগুলো
- ডিএসইএক্স: ডিএসইর প্রধান বা "ব্রড" সূচক। আন্তর্জাতিক সূচক প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপির নকশায়, ফ্রি-ফ্লোট পদ্ধতিতে, চালু হয় জানুয়ারি ২০১৩-তে। শুরুতে এতে ছিল ১৯৯টা কোম্পানি, যা তখন বাজারমূল্যের প্রায় ৯৩%। প্রথম দিন শেষ হয় ৪,০৯০.৪৭ পয়েন্টে।
- ডিএস৩০: ৩০টা বড় কোম্পানির সূচক, একই সময়ে চালু। লাভ, বাজারমূল্য ইত্যাদির ভিত্তিতে বাছাই, প্রতি ছয় মাসে পর্যালোচনা।
- ডিএসইএস: শরিয়াহভিত্তিক সূচক, জানুয়ারি ২০১৪ থেকে, ভিত্তি ১,০০০ পয়েন্ট। মদ, শূকরজাত পণ্য, জুয়া, অস্ত্রের মতো ব্যবসা বাদ দিয়ে ডিএসইএক্সেরই একটা অংশ; ২০২৩ সালে এতে ছিল প্রায় ৭০টা কোম্পানি।
- সিএসইর সূচক: চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সব শেয়ারের সূচক সিএএসপিআই (CASPI) খবরে সবচেয়ে বেশি আসে। এর পয়েন্ট ডিএসইএক্সের চেয়ে অনেক বড় সংখ্যা, কারণ ভিত্তি আর পদ্ধতি আলাদা; দুই সূচকের পয়েন্ট সরাসরি তুলনা করা যায় না।
সূচক যা বলে না
- ডিভিডেন্ড: ডিএসইএক্সের মতো প্রাইস ইনডেক্স শুধু দাম দেখে। ডিভিডেন্ড ধরলে ইনভেস্টরের মোট রিটার্ন সাধারণত সূচকের চেয়ে কিছুটা বেশি।
- আপনার নিজের ফল: আপনার পোর্টফোলিওতে সূচকের কোম্পানিগুলো একই অনুপাতে নেই, তাই সূচক বাড়লেও আপনার শেয়ার কমতে পারে।
- বাজার সস্তা না দামি: সূচক ৫,০০০ না ৭,০০০, তা দিয়ে শেয়ারের দাম কোম্পানির আয়ের তুলনায় বেশি না কম, বলা যায় না।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক বাজারে তিনটা কোম্পানি। ক: দাম ২০০ টাকা, ১০ লাখ শেয়ার, বাজারমূল্য ২০ কোটি টাকা। খ: দাম ২০ টাকা, ৫০ লাখ শেয়ার, বাজারমূল্য ১০ কোটি। গ: দাম ৫০ টাকা, ৪০ লাখ শেয়ার, বাজারমূল্য ২০ কোটি। মোট বাজারমূল্য ৫০ কোটি টাকা।
- ক-এর দাম ১০% বাড়ল (২২০ টাকা)। প্রাইস-ওয়েটেড সূচক: দামের যোগফল ২৭০ থেকে ২৯০, বাড়ল প্রায় ৭.৪%। মার্কেট-ক্যাপ সূচক: মোট বাজারমূল্য ৫০ থেকে ৫২ কোটি, বাড়ল ৪%।
- এবার ক-এর বদলে খ-এর দাম ১০% বাড়লে (২২ টাকা): প্রাইস-ওয়েটেড সূচক ২৭০ থেকে ২৭২, বাড়ল মাত্র ০.৭৪%। মার্কেট-ক্যাপ সূচক ৫০ থেকে ৫১ কোটি, বাড়ল ২%।
ফল: একই ১০% দাম বাড়া সূচককে কতটা নাড়াবে, তা নির্ভর করে সূচকের ওজনের নিয়মের ওপর। মার্কেট-ক্যাপ সূচকে বড় কোম্পানির নড়াচড়া সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "সূচক বেড়েছে, তাই আমার শেয়ারও বেড়েছে" ভাবা। সূচক গড়, আপনার পোর্টফোলিও নয়।
- পয়েন্ট দেখে উত্তেজিত বা আতঙ্কিত হওয়া। ৪,০০০ থেকে ১০০ পয়েন্ট মানে ২.৫%, ৮,০০০ থেকে মানে ১.২৫%।
- সূচকের দীর্ঘ হিসাবকে মোট রিটার্ন ধরা। প্রাইস ইনডেক্সে ডিভিডেন্ড নেই।
- ভিন্ন সূচকের পয়েন্ট তুলনা করা, যেমন "সিএএসপিআই ডিএসইএক্সের চেয়ে অনেক বেশি"। ভিত্তি আলাদা হলে পয়েন্টের তুলনা অর্থহীন।
সূচক অনেক শেয়ারের দাম মিলিয়ে বানানো একটা মাপকাঠি: পয়েন্ট নয়, শতাংশ দেখুন, আর মনে রাখুন এটা বাজারের গড়, আপনার পোর্টফোলিও নয়।