এসআইপি কী
এসআইপি মানে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান: প্রতি মাসে (বা প্রতি তিন মাসে) একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক দিয়ে কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট বা অন্য সম্পদ কেনা। বাংলাদেশে অনেক ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড এভাবে মাসিক কিস্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়। নিজে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কে শেয়ার কেনাও একই ধারণা।
যেহেতু অঙ্কটা একই থাকে, দাম কম থাকলে বেশি ইউনিট কেনা হয়, আর দাম বেশি থাকলে কম। একে বলে কস্ট অ্যাভারেজিং বা গড় খরচ। এর ফলে আপনার প্রতি ইউনিটের গড় খরচ সাধারণত ওই সময়ের গড় দামের চেয়ে কিছুটা কম হয়।
ধরা যাক নাদিয়া চাকরি শুরু করেছেন, বেতন পান মাসের ১ তারিখে। তিনি ঠিক করলেন প্রতি মাসের ৫ তারিখে ৩,০০০ টাকা একটা ফান্ডে চলে যাবে, বাজার যেমনই থাকুক। প্রথম মাসে বাজার পড়ল, দ্বিতীয় মাসে উঠল, তিনি খবরের দিকে না তাকিয়ে চালিয়ে গেলেন। বছর শেষে ৩৬,০০০ টাকা জমা হলো, আর "কখন কিনব" নিয়ে একদিনও মাথা ঘামাতে হলো না। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- বেতনের সঙ্গে মেলে: বেশিরভাগ মানুষের হাতে একবারে বড় টাকা থাকে না, থাকে মাসিক আয়। এসআইপি সেই মাসিক আয় থেকেই ইনভেস্ট করার পথ।
- সময় ধরার চাপ কমায়: কখন বাজার সবচেয়ে নিচে, তা কেউ নিশ্চিত জানে না। নিয়মিত কিনলে সেই অনুমানের দরকার পড়ে না।
- আবেগ সামলায়: পতনের সময় ভয়ে থেমে যাওয়ার বদলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম দামে বেশি ইউনিট কেনা হয়।
- অভ্যাস তৈরি করে: আগে ইনভেস্ট, পরে খরচ। নিয়মিত টাকা কেটে নিলে সঞ্চয় আর ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করে না।
একবারে বনাম ধাপে ধাপে
হাতে যদি আগে থেকেই বড় অঙ্ক থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে: একবারে ইনভেস্ট করব, না কয়েক মাসে ভাগ করে? যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় ফান্ড প্রতিষ্ঠানের ২০১২ সালের গবেষণায়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহাসিক তথ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় একবারে বিনিয়োগ ১২ মাসে ভাগ করে বিনিয়োগের চেয়ে ভালো ফল দিয়েছে। কারণ বাজার বেশিরভাগ সময় ওপরের দিকে যায়, আর অপেক্ষার টাকা ততদিন কম আয় করে।
তবে বাকি এক-তৃতীয়াংশ সময় ধাপে ধাপে বিনিয়োগ ভালো করেছে, আর অনেকের কাছে একবারে সব টাকা দিয়ে পরদিনই বড় পতন দেখার কষ্ট অনেক বেশি। তাই এটা হিসাবের সঙ্গে মনেরও প্রশ্ন। আর যাঁর আয় মাসিক, তাঁর জন্য প্রশ্নটাই আলাদা: নিয়মিত বিনিয়োগই স্বাভাবিক পথ।
ডিপিএস আর এসআইপি: মিল আর অমিল
- মিল: দুটোতেই প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্ক জমা হয়, আর দুটোই সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে।
- অমিল: ডিপিএসে মেয়াদ আর সুদের হার আগে থেকে জানা থাকে। এসআইপিতে ফল নির্ভর করে ফান্ড বা শেয়ারের দামের ওপর, তাই লাভ বেশি হতে পারে, আবার লোকসানও হতে পারে।
- এসআইপি লোকসান ঠেকায় না: বাজার দীর্ঘ সময় নিচে থাকলে নিয়মিত কিনেও লোকসানে থাকা সম্ভব। এটা ঝুঁকি ছড়িয়ে দেয়, দূর করে না।
হাতে-কলমে হিসাব
- প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা দিয়ে একটা ফান্ডের ইউনিট কেনা হলো। ধরা যাক চার মাসে ইউনিটের দাম ছিল ১০০, ৮০, ৫০ আর ৮০ টাকা।
- কেনা ইউনিট: ২০, ২৫, ৪০ আর ২৫। মোট ১১০ ইউনিট, মোট বিনিয়োগ ৮,০০০ টাকা।
- আপনার প্রতি ইউনিটের গড় খরচ: ৮,০০০ ÷ ১১০ ≈ ৭২.৭ টাকা। অথচ চার মাসের গড় দাম ছিল ৭৭.৫ টাকা।
- চতুর্থ মাস শেষে দাম ৮০ টাকা: আপনার ১১০ ইউনিটের মূল্য ৮,৮০০ টাকা।
ফল: দাম শুরুর ১০০ টাকার নিচে থাকলেও আপনি প্রায় ১০% লাভে, কারণ দাম কম থাকার সময় বেশি ইউনিট কেনা হয়েছে। দাম যদি আরও নামত, আপনিও লোকসানে থাকতেন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- বাজার পড়লে এসআইপি বন্ধ করে দেওয়া। ঠিক তখনই কম দামে বেশি ইউনিট কেনার সুযোগ থাকে।
- এসআইপিকে "নিশ্চিত লাভ" বা ডিপিএসের মতো ভাবা। এর ফল বাজারের ওপর নির্ভর করে।
- কী কিনছেন না বুঝে শুধু নিয়মিত কিনতে থাকা। নিয়মিত কেনা ভালো অভ্যাস, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে সেটা বোঝাও জরুরি।
- ইমার্জেন্সি ফান্ড না রেখেই এসআইপি শুরু করা, তারপর হঠাৎ দরকারে খারাপ সময়ে তুলে ফেলা।
নিয়মিত, নির্দিষ্ট অঙ্কে ইনভেস্ট করলে বাজারের সময় আন্দাজের দরকার পড়ে না: অভ্যাসটা চালু রাখাই এর আসল শক্তি।