দাম আর রেটের দোলনা
বন্ডের দাম আসলে একটা প্রশ্নের উত্তর: ভবিষ্যতে যে কুপন আর ফেস ভ্যালু আসবে, সেগুলোর আজকের মূল্য কত? এই "আজকের মূল্য" বের করতে বাজারের চলতি সুদের হার দিয়ে ভবিষ্যতের টাকাকে ছোট করে আনা হয়, যাকে বলে ডিসকাউন্টিং। রেট যত বেশি, ভবিষ্যতের প্রতিটি টাকার আজকের মূল্য তত কম, তাই বন্ডের দামও কম।
আরেকভাবে দেখলে: বন্ডের কুপন বাঁধা, কিন্তু নতুন ক্রেতা বাজারের সমান রিটার্ন চায়। রেট বাড়লে পুরোনো বন্ডের দাম ততটা কমতে হয়, যাতে ক্রেতার ইল্ড নতুন রেটের সমান হয়। রেট কমলে উল্টো, পুরোনো বেশি কুপনের বন্ডের দাম বাড়ে।
ধরা যাক তানিয়ার কাছে ১০ বছর মেয়াদি একটা বন্ড আছে, কুপন ১০%। হঠাৎ বাজারে নতুন বন্ড ১২% দিচ্ছে। একই সময়ে তাঁর ভাইয়ের কাছে আছে ২ বছর বাকি এমন ১০% কুপনের বন্ড। দুজনের বন্ডেরই দাম কমবে, কিন্তু তানিয়ারটা অনেক বেশি, কারণ তাঁকে "কম কুপনের শাস্তি" বইতে হবে দশ বছর, ভাইকে মাত্র দুই বছর। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
রেট কমলে উল্টোটা ঘটে: আগের বন্ডের দাম বাড়ে।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- ঝুঁকি আগে থেকে মাপতে: ডিউরেশন জানলে আন্দাজ করা যায় রেট ১% বাড়লে বন্ডের দাম মোটামুটি কত শতাংশ কমতে পারে।
- মেয়াদ আর প্রয়োজন মেলাতে: যে টাকা শিগগির লাগতে পারে, তা লম্বা মেয়াদের বন্ডে থাকলে রেট বাড়ার সময় কম দামে বেচতে হতে পারে।
- বন্ড ফান্ড বুঝতে: ফান্ডের নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই, তাই রেট বাড়লে ইউনিটের দাম কমা "মেয়াদ পর্যন্ত রেখে দিয়ে" এড়ানো যায় না।
- সরকারি বন্ডেও ঝুঁকি চিনতে: সরকারের ডিফল্টের ঝুঁকি কম হলেও রেটের কারণে দামের ঝুঁকি সব বন্ডেই আছে।
ডিউরেশন: একটা সংখ্যায় রেট-সংবেদনশীলতা
ডিউরেশন মাপে বন্ডের দাম সুদের হারের প্রতি কতটা সংবেদনশীল। সহজ নিয়ম: রেট ১ শতাংশ পয়েন্ট বদলালে বন্ডের দাম উল্টো দিকে মোটামুটি ডিউরেশনের সমান শতাংশ নড়ে। ডিউরেশন ১০ হলে রেট ১% বাড়লে দাম প্রায় ১০% কমে, ১% কমলে প্রায় ১০% বাড়ে।
ডিউরেশনকে ভাবতে পারেন "গড়ে কত বছরে টাকা ফেরত আসে" হিসেবে। যে বন্ডে টাকার বড় অংশ অনেক দূরে, শেষে আসে, তার ডিউরেশন বেশি। তাই জিরো-কুপন বন্ডের ডিউরেশন প্রায় তার মেয়াদের সমান, আর কুপনওয়ালা বন্ডের ডিউরেশন মেয়াদের চেয়ে কম।
- মেয়াদ যত লম্বা, ডিউরেশন তত বেশি, দামের দোলও তত বড়।
- কুপন যত কম, ডিউরেশন তত বেশি, কারণ টাকার বেশি অংশ শেষে আসে।
নিয়মের সীমা আর অন্য দিক
বাংলাদেশে এর একটা বাস্তব ছবি দেখা গেছে। ২০২১ সালে লম্বা মেয়াদি সরকারি বন্ডের নিলামে ইল্ড ছিল প্রায় ৬–৭%, আর মার্চ ২০২৫-এ ১০ বছরের বন্ডের ইল্ড ১২% ছাড়ায়। ২০২১-এর কম কুপনের লম্বা বন্ড যিনি মাঝপথে বেচতে চেয়েছেন, তাঁকে কাগজে বড় দরপতন মানতে হওয়ার কথা।
- ডিউরেশনের নিয়ম ছোট পরিবর্তনে ভালো কাজ করে। বড় পরিবর্তনে রেট কমলে দাম নিয়মের চেয়ে একটু বেশি বাড়ে, আর রেট বাড়লে নিয়মের চেয়ে একটু কম কমে।
- মেয়াদ পর্যন্ত রাখলে, আর ইস্যুকারী ঠিকমতো দিলে, পুরো ফেস ভ্যালু আর সব কুপন আসে। মাঝপথের দরপতন তখন কাগজে থাকে।
- উল্টো ঝুঁকিও আছে: রেট কমলে বন্ডের দাম বাড়ে ঠিকই, কিন্তু হাতে আসা কুপন বা মেয়াদপূর্তির টাকা আবার কম রেটে খাটাতে হয়। একে বলে রিইনভেস্টমেন্ট রিস্ক।
- শুধু সাধারণ রেট নয়: ইস্যুকারীর প্রতি আস্থা কমলে তার বন্ডে বাড়তি ইল্ড চাওয়া হয়, তাতেও দাম কমে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক তিনটি বন্ড, প্রতিটির ফেস ভ্যালু ১,০০,০০০ টাকা, কুপন বছরে ১০% (বছরে একবার), বাজারের রেট ১০%, তাই সবগুলোর দাম ১,০০,০০০ টাকা। মেয়াদ বাকি: ২, ৫ আর ১০ বছর।
- রেট বেড়ে ১২% হলে দাম হয় প্রায় ৯৬,৬০০ (−৩.৪%), ৯২,৮০০ (−৭.২%) আর ৮৮,৭০০ টাকা (−১১.৩%)।
- রেট কমে ৮% হলে দাম হয় প্রায় ১,০৩,৬০০ (+৩.৬%), ১,০৮,০০০ (+৮.০%) আর ১,১৩,৪০০ টাকা (+১৩.৪%)। ১০ বছরের বন্ডটির ডিউরেশন প্রায় ৬, তাই রেট ১% নড়লে দাম নড়ে প্রায় ৬%।
ফল: মেয়াদ যত লম্বা, রেটের একই পরিবর্তনে দাম তত বেশি নড়ে; আর রেট কমলে দাম যতটা বাড়ে, রেট বাড়লে ততটা কমে না। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র, কর বাদ দিয়ে।
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| রেট ১২% হলে | রেট ৮% হলে | |
|---|---|---|
| ২ বছর বাকি | -৩.৪% | ৩.৬% |
| ৫ বছর বাকি | -৭.২% | ৮% |
| ১০ বছর বাকি | -১১.৩% | ১৩.৪% |
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- মেয়াদ আর ডিউরেশন এক ভাবা। কুপনওয়ালা বন্ডের ডিউরেশন মেয়াদের চেয়ে কম, আর কুপন কম হলে বেশি।
- শিগগির লাগবে এমন টাকা লম্বা মেয়াদের বন্ডে রাখা, তারপর রেট বাড়ার সময় কম দামে বেচতে বাধ্য হওয়া।
- রেট কমার আশায় লম্বা বন্ড কেনাকে নিশ্চিত লাভ ভাবা। রেট কোন দিকে যাবে, তা কেউ নিশ্চিত জানে না।
- ভাবা যে বন্ড ফান্ডও মেয়াদ পর্যন্ত রেখে দিলে দামের ঝুঁকি চলে যায়। ফান্ডের নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই।
রেট আর বন্ডের দাম উল্টো দিকে চলে, আর কতটা চলবে তা বলে ডিউরেশন: মোটামুটি, রেট ১% বদলালে দাম ডিউরেশনের সমান শতাংশ নড়ে। মেয়াদ লম্বা বা কুপন কম হলে ধাক্কা বেশি।