প্রাইস ডিসকভারি কী
স্ক্রিনে যে দাম দেখেন, সেটা আসলে শেষ যে দামে একটা কেনাবেচা হয়েছে, সেই দাম। কেউ বলছে "৫০ টাকায় কিনব", কেউ বলছে "৫১ টাকায় বেচব"। যতক্ষণ দুই পক্ষ এক দামে রাজি না হয়, কোনো লেনদেন হয় না। যখন রাজি হয়, সেই দামটাই হয়ে যায় নতুন "বাজারদর"।
প্রত্যেক ক্রেতা-বিক্রেতা নিজের তথ্য, হিসাব, আশা আর ভয় নিয়ে অর্ডার দেন। সব অর্ডার মিলে যে দাম দাঁড়ায়, তা বাজারের সবার মতামতের একটা চলমান "ভোট"। নতুন খবর এলে ভোট বদলায়, দামও বদলায়। তাই দাম মানে কোম্পানির আসল মূল্য নয়, বরং এই মুহূর্তে মানুষ কত দিতে আর নিতে রাজি, তার ছবি।
ঈদের আগের দিন গরুর হাটের কথা ভাবুন। কোনো সরকারি দাম নেই। বিক্রেতা চাইছেন ১,২০,০০০ টাকা, ক্রেতা বলছেন ৯০,০০০। দর-কষাকষিতে কোথাও একটা দাম মেলে, আর সেই খবর হাটে ছড়িয়ে পড়ে: "আজ এই সাইজের গরু এক লাখের আশপাশে যাচ্ছে।" বিকেলে হাটে গরু কমে গেলে দাম বাড়ে, বেশি থাকলে কমে। শেয়ারবাজারেও একই কাজ হয়, শুধু হাটের বদলে কম্পিউটারে, সেকেন্ডে সেকেন্ডে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- দাম আর মূল্য আলাদা বুঝতে: স্ক্রিনের দাম শুধু শেষ লেনদেনের দাম। কোম্পানির ব্যবসা আসলে কত মূল্যবান, তা আলাদা প্রশ্ন।
- লুকোনো খরচ ধরতে: কেনার দাম আর বেচার দামের মধ্যে একটা ফাঁক (স্প্রেড) থাকে। এখনই কিনে এখনই বেচলে এই ফাঁকটুকু আপনার খরচ, ব্রোকারের কমিশনের ওপরে।
- কম লেনদেনের শেয়ারের ঝুঁকি বুঝতে: যে শেয়ারে ক্রেতা-বিক্রেতা কম, সেখানে অল্প কয়েকটা অর্ডারেই দাম অনেক লাফাতে পারে, আর দরকারের সময় ভালো দামে বেচা কঠিন হয়।
- খবর আর গুজবের প্রভাব বুঝতে: দাম বদলায় মানুষের প্রত্যাশা বদলালে। কোনো খবর আগেই সবার জানা থাকলে, প্রকাশের দিন দাম হয়তো তেমন নড়েই না।
অর্ডার বুক: বাজারের দুই সারি
এক্সচেঞ্জের কম্পিউটারে প্রতিটা শেয়ারের জন্য একটা "অর্ডার বুক" থাকে। এক পাশে ক্রেতাদের সারি: কে কত দামে কতগুলো কিনতে চান, একে বলে বিড। অন্য পাশে বিক্রেতাদের সারি: কে কত দামে বেচতে চান, একে বলে আস্ক বা অফার। সবচেয়ে বেশি বিড আর সবচেয়ে কম আস্কের পার্থক্যই স্প্রেড।
ইলেকট্রনিক এক্সচেঞ্জগুলো সাধারণত নিজে থেকেই অর্ডার মেলায়: ক্রেতার দাম বিক্রেতার দামে পৌঁছালেই লেনদেন। একই দামে কয়েকজন থাকলে সাধারণত যিনি আগে অর্ডার দিয়েছেন, তিনি আগে পান। এখানে কোনো মানুষ দাম "ঠিক করে" না; দাম তৈরি হয় অর্ডারগুলো থেকেই।
- যে শেয়ার প্রতিদিন অনেক লেনদেন হয়, তার স্প্রেড সাধারণত ছোট আর দুই সারিতেই অনেক অর্ডার থাকে। কম লেনদেনের শেয়ারে স্প্রেড বড়, সারিও পাতলা।
ডিএসইতে দিনের দাম কীভাবে তৈরি হয়
নভেম্বর ২০২০ থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মূল লেনদেন শুরুর আগে ১৫ মিনিটের একটা প্রি-ওপেনিং সেশন চালু হয়েছে। এই সময়ে অর্ডার জমা নেওয়া হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মেলানো হয় না। তারপর যে দামে সবচেয়ে বেশি অর্ডার মেলে, সেটাই হয় ওপেনিং প্রাইস। আগে আগের দিনের ক্লোজিং প্রাইসই ছিল শুরুর ভিত্তি।
নিয়মিত সেশনে সারা দিন অর্ডার মিলতে থাকে। দিনের "ক্লোজিং প্রাইস" কিন্তু শেষ লেনদেনের দাম নয়: দুই এক্সচেঞ্জই এটা হিসাব করে শেষ ৩০ মিনিটের লেনদেনের গড় দাম থেকে। এরপর ১০ মিনিটের একটা পোস্ট-ক্লোজিং সেশনে শুধু সেই ক্লোজিং প্রাইসে কেনাবেচা করা যায়। লেনদেনের সময় আর এসব নিয়ম মাঝে মাঝে বদলায়, যেমন রমজানে; সর্বশেষ নিয়ম এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে থাকে।
দাম কেন নড়ে
- নতুন তথ্য: আয়ের ফল, ডিভিডেন্ডের ঘোষণা, সুদের হার, অর্থনীতির খবর। মানুষের প্রত্যাশা বদলালে তাঁদের অর্ডারের দামও বদলায়।
- কে বেশি তাড়ায়: যিনি এখনই কিনতে চান, তাঁকে বিক্রেতার দামে যেতে হয়; যিনি এখনই বেচতে চান, তাঁকে ক্রেতার দামে নামতে হয়। তাড়াহুড়োর পক্ষ যেদিকে বেশি, দাম সেদিকে যায়।
- টাকার প্রবাহ: বাজারে নতুন টাকা ঢুকলে অনেক শেয়ারের দাম একসঙ্গে বাড়তে পারে, টাকা বের হলে একসঙ্গে কমতে পারে, কোম্পানির খবর ছাড়াই।
- গুজব ও কারসাজি: পাতলা অর্ডার বুকের শেয়ারে অল্প টাকা দিয়েই দাম ঠেলে তোলা যায়। এ কারণেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা অস্বাভাবিক দাম ওঠানামার ওপর নজর রাখে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা শেয়ারের অর্ডার বুক এমন: ক্রেতা ৩০০টা @ ৫০.০০ টাকা, ৫০০টা @ ৪৯.৯০ টাকা। বিক্রেতা ২০০টা @ ৫০.২০ টাকা, ৪০০টা @ ৫০.৩০ টাকা। শেষ লেনদেন হয়েছিল ৫০.১০ টাকায়। স্প্রেড ০.২০ টাকা।
- রুমানা এখনই ৫০০টা শেয়ার কিনতে চান, আর ৫০.৩০ টাকা পর্যন্ত দিতে রাজি। প্রথমে তিনি পান ২০০টা @ ৫০.২০ (১০,০৪০ টাকা), তারপর ৩০০টা @ ৫০.৩০ (১৫,০৯০ টাকা)। মোট ২৫,১৩০ টাকা, গড়ে শেয়ারপ্রতি ৫০.২৬ টাকা।
- শেষ লেনদেন এখন ৫০.৩০ টাকায়। কোম্পানির কোনো খবর ছাড়াই স্ক্রিনের দাম ৫০.১০ থেকে ৫০.৩০ হলো, প্রায় ০.৪% বেশি। এখনই বেচতে চাইলে রুমানা পাবেন সর্বোচ্চ বিড ৫০.০০ টাকা।
ফল: দাম বদলায় যখন কেউ স্প্রেড পার হয়ে অন্য পক্ষের দামে রাজি হন। তাড়াহুড়োর কেনাবেচায় স্প্রেডটুকু খরচ হয়। যে শেয়ারের সারি যত পাতলা, এক অর্ডারে দাম তত বেশি সরে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- স্ক্রিনের দামকেই কোম্পানির "আসল মূল্য" ভাবা। দাম শুধু শেষ লেনদেনের দাম।
- "দাম বাড়ছে মানে ভেতরে নিশ্চয়ই ভালো খবর আছে" ধরে নেওয়া। কম লেনদেনের শেয়ারে অল্প কয়েকটা অর্ডারেই দাম লাফাতে পারে।
- স্প্রেড উপেক্ষা করা, বিশেষ করে ঘন ঘন কেনাবেচায়। প্রতিবার এই ফাঁকটুকু খরচ হয়।
- ধরে নেওয়া যে কাগজের দামে যেকোনো পরিমাণ শেয়ার বেচা যাবে। বড় অঙ্ক বেচলে দাম নিচে নামতে পারে।
শেয়ারের দাম কেউ বসিয়ে দেয় না; ক্রেতা আর বিক্রেতার অর্ডার যেখানে মেলে, সেখানেই দাম। স্ক্রিনের দাম শেষ লেনদেন, কোম্পানির মূল্যের রায় নয়।