গভর্নমেন্ট ডেট কী
কোনো বছরে সরকারের খরচ আয়ের চেয়ে বেশি হলে যে ফারাক থাকে, তাকে বলে বাজেট ঘাটতি। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার ধার করে। প্রতি বছরের ঘাটতি আর আগের ঋণ মিলিয়ে সরকারের মোট যত দেনা জমে, সেটাই গভর্নমেন্ট ডেট বা সরকারি ঋণ। ঘাটতি হলো এক বছরের ফারাক, ঋণ হলো এতদিনের জমা হিসাব।
ঋণ দুই রকম জায়গা থেকে আসে। দেশের ভেতর থেকে: ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান ট্রেজারি বিল-বন্ড কেনে, আর সাধারণ মানুষ কেনে সঞ্চয়পত্র। দেশের বাইরে থেকে: বিশ্বব্যাংক, এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা আর অন্য দেশের সরকার থেকে ঋণ। দেশি ঋণ সাধারণত টাকায়, বিদেশি ঋণ বেশিরভাগ ডলার বা অন্য বিদেশি মুদ্রায় শোধ করতে হয়।
ধরা যাক নাসরিন খালা অবসরের পর ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনলেন। তিনি হয়তো ভাবছেন টাকাটা "সঞ্চয়" করলেন, কিন্তু আসলে তিনি সরকারকে ৫ বছরের জন্য ধার দিলেন। সরকার সেই টাকা বাজেটের খরচে লাগায়, আর বিনিময়ে তাঁকে নিয়মিত মুনাফা দেয়। তাঁর পাশের বাড়ির যে ব্যাংকে টাকা জমা আছে, সেই ব্যাংকও হয়তো সরকারের ট্রেজারি বিল কিনে রেখেছে। এভাবে দেশের অনেক মানুষ না জেনেই সরকারের ঋণদাতা। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- আপনি নিজেই ঋণদাতা হতে পারেন: সঞ্চয়পত্র, ট্রেজারি বিল-বন্ড, সুকুক, প্রবাসী বন্ড, সবই সরকারকে ধার দেওয়ার উপায়। সরকারের ধারের চাহিদা বাড়লে এগুলোর সুদ বা মুনাফার হারও সাধারণত বাড়ে।
- সুদের হারে প্রভাব: সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ধার নিলে ব্যাংকের টাকা সেদিকে যায়। তখন ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের লোনের সুদ বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে; অর্থনীতিবিদরা একে বলেন "ক্রাউডিং আউট"।
- টাকার মানে প্রভাব: বিদেশি ঋণের কিস্তি ডলারে দিতে হয়। কিস্তি বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়ে, যা এক্সচেঞ্জ রেটে চাপ ফেলতে পারে।
- ভবিষ্যতের ট্যাক্স ও খরচে প্রভাব: আজকের ঋণের সুদ আগামী বছরের বাজেট থেকে দিতে হয়। সুদের খরচ বড় হলে অন্য খাতে খরচ কমানো বা ট্যাক্স বাড়ানোর চাপ আসে।
বাংলাদেশের ঋণ কত বড়
ঋণ কত বড়, তা টাকার অঙ্কে না দেখে সাধারণত দেখা হয় জিডিপির তুলনায়, কারণ বড় অর্থনীতি বেশি ঋণ বইতে পারে। আইএমএফের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট সরকারি খাতের ঋণ ছিল জিডিপির প্রায় ৪২.১%, যার মধ্যে বিদেশি ঋণ প্রায় ১৯.৫%। আইএমএফের প্রক্ষেপণে পরের দুই বছরে এই অনুপাত সামান্য বেড়ে ৪২–৪৩%-এর মধ্যে থাকার কথা।
সুদের খরচও দেখার মতো। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার সুদ বাবদ খরচ করেছে প্রায় ১.৩৬ লাখ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সুদের জন্য রাখা হয়েছিল প্রায় ১.২৭ লাখ কোটি টাকা, যা মোট রাজস্ব লক্ষ্যের (প্রায় ৬.৯৫ লাখ কোটি) প্রায় ১৮%। সংখ্যাগুলো প্রতি বছর বদলায়।
ঘাটতি কোথা থেকে মেটানো হয়
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল প্রায় ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১.০৯ লাখ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ থেকে, প্রায় ১.১২ লাখ কোটি টাকা দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে, আর প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এই মিশ্রণ বছরে বছরে বদলায়, আর বছর শেষে আসল চিত্র পরিকল্পনা থেকে আলাদা হতে পারে।
- বিদেশি ঋণ: অনেক সময় সুদ কম আর মেয়াদ লম্বা, কিন্তু শোধ করতে হয় ডলারে। টাকার মান কমলে একই ডলারের কিস্তি শোধ করতে বেশি টাকা লাগে।
- ব্যাংক থেকে ঋণ: টাকায়, তবে ব্যাংকের যে টাকা ব্যবসায় লোন হতে পারত, তার একটা অংশ সরকারের দিকে যায়।
- সঞ্চয়পত্র: সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরাসরি ধার। মুনাফার হার বাজার নিলামে নয়, সরকার নিজে ঠিক করে, আর সেই মুনাফা বাজেট থেকেই দিতে হয়।
কতটা ঋণ "বেশি"?
- কোনো একটা নির্দিষ্ট সীমা নেই যার নিচে সব নিরাপদ আর ওপরে সব বিপদ। জাপানের সরকারি ঋণ জিডিপির দ্বিগুণেরও বেশি, আবার অনেক কম ঋণেও কিছু দেশ সংকটে পড়েছে।
- যা বেশি জরুরি: আয়ের তুলনায় সুদের খরচ কত, ঋণ কোন মুদ্রায়, মেয়াদ কত লম্বা, আর অর্থনীতি ঋণের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে কি না।
- কতটা ঋণ সুস্থ, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে; আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নিয়মিত দেশগুলোর ঋণ-ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা দেশের জিডিপি ১০০ টাকা, সরকারি ঋণ ৪০ টাকা। ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৪০%।
- পরের বছর দাম ও উৎপাদন মিলিয়ে জিডিপি ১০% বেড়ে হলো ১১০ টাকা। সরকার নতুন ধার করল ৪ টাকা, ঋণ হলো ৪৪ টাকা। অনুপাত ৪৪ ÷ ১১০ = ৪০%, একই রইল।
- কিন্তু যদি জিডিপি মাত্র ৫% বেড়ে ১০৫ টাকা হয় আর সরকার ধার করে ৬ টাকা, ঋণ হয় ৪৬ টাকা। অনুপাত ৪৬ ÷ ১০৫ ≈ ৪৩.৮%।
ফল: ঋণের অঙ্ক বাড়া মানেই বোঝা বাড়া নয়। অর্থনীতি কত দ্রুত বাড়ছে আর নতুন ধার কত, এই দুইয়ের তুলনাই ঠিক করে বোঝা হালকা হচ্ছে না ভারী। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু টাকার অঙ্কে ঋণ দেখা ("লাখ লাখ কোটি টাকা!")। জিডিপি আর রাজস্বের তুলনায় না দেখলে সংখ্যাটা কিছু বলে না।
- সরকারকে একটা পরিবারের মতো ভাবা। সরকার ট্যাক্স নিতে পারে, অনির্দিষ্টকাল চলে, আর দেশি ঋণ নিজের মুদ্রায় নেয়; তাই হিসাবটা পুরোপুরি এক নয়।
- উল্টোটাও ভুল: "সরকারি ঋণের কোনো সমস্যা নেই" ভাবা। সুদের খরচ আর বিদেশি মুদ্রার ঋণ বেশি হলে চাপ সত্যিই তৈরি হয়।
- সরকারি সিকিউরিটিকে সব রকম রিস্ক থেকে মুক্ত ভাবা। খেলাপির ঝুঁকি কম হলেও ইনফ্লেশন আর সুদের হার বদলের রিস্ক থাকে।
সরকারি ঋণ বিচার করুন জিডিপি আর রাজস্বের তুলনায়, শুধু টাকার অঙ্কে নয়; আর মনে রাখুন, সঞ্চয়পত্র বা ট্রেজারি বিল কিনলে আপনিই সেই ঋণের একজন ঋণদাতা।