ডাইভারসিফিকেশন কী
ডাইভারসিফিকেশন মানে রিস্ক কমাতে টাকা বিভিন্ন ইনভেস্টমেন্টে ভাগ করে রাখা। পুরোনো কথাটাই এর সারকথা: সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখবেন না। একটা কোম্পানি, একটা খাত বা একটা প্রতিষ্ঠানে সমস্যা হলে, বাকিগুলো তখনও ঠিক থাকতে পারে।
মূল কৌশলটা হলো এমন জিনিস বেছে নেওয়া যেগুলো একই সময়ে একই দিকে চলে না। একটা যখন খারাপ করে, আরেকটা তখন ভালো বা অন্তত স্থির থাকে। ফলে মোট টাকার ওঠানামা কমে, যদিও কোনো একটা অংশ আলাদাভাবে বেশি ওঠানামা করতে পারে।
ধরা যাক মিজান সাহেবের মোড়ে একটা ছোট দোকান। শুধু ছাতা বিক্রি করলে বর্ষায় ভালো আয়, কিন্তু শুকনো মাসে প্রায় কিছুই না। শুধু শরবত বিক্রি করলে গরমে ভালো, বৃষ্টিতে খারাপ। দুটোই রাখলে সারা বছর আয় অনেক বেশি স্থির থাকে, কারণ একটার খারাপ সময়ে আরেকটা চলে। ইনভেস্টমেন্টেও ডাইভারসিফিকেশন এভাবেই কাজ করে। চরিত্রটি কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- একটা ভুলের দাম কমাতে: কোনো একটা ইনভেস্টমেন্ট পুরোপুরি ডুবে গেলেও সেটা আপনার সঞ্চয়ের একটা অংশ মাত্র।
- শান্ত থাকতে: মোট টাকার ওঠানামা কম হলে খারাপ সময়ে আতঙ্কে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কমে।
- ভবিষ্যৎ না জেনেও প্রস্তুত থাকতে: কোন খাত বা অ্যাসেট সামনে ভালো করবে, কেউ নিশ্চিত জানে না। ভাগ করে রাখা সেই অনিশ্চয়তা স্বীকার করার একটা উপায়।
- প্রায় বিনা খরচে রিস্ক কমাতে: ঠিকভাবে করলে প্রত্যাশিত রিটার্ন খুব একটা না কমিয়েই রিস্ক কমানো যায়।
কোন রিস্ক কমে, কোনটা কমে না
রিস্কের দুটো ভাগ আছে। একটা হলো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা খাতের রিস্ক: খারাপ ব্যবস্থাপনা, প্রতারণা, একটা পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া। এটা ডাইভারসিফিকেশনে অনেকটাই কমানো যায়, কারণ সব কোম্পানিতে একসঙ্গে এমন হয় না।
অন্যটা হলো পুরো বাজারের রিস্ক: অর্থনৈতিক মন্দা, সুদের হার বাড়া, পুরো শেয়ারবাজারে পতন। একই বাজারের মধ্যে যত শেয়ারই কিনুন, এটা পুরোপুরি এড়ানো যায় না। এজন্য শুধু অনেক শেয়ার নয়, বিভিন্ন ধরনের অ্যাসেটেও (শেয়ার, বন্ড, আমানত, সোনা) ভাগ করার কথা বলা হয়।
কতটা যথেষ্ট, আর ভুয়া ডাইভারসিফিকেশন
- কতটা: মার্কিন রেগুলেটর এসইসি-র ইনভেস্টর গাইড বলছে, শুধু আলাদা আলাদা শেয়ার দিয়ে ভালোভাবে ডাইভারসিফাই করতে অন্তত এক ডজন যত্ন করে বাছাই করা শেয়ার লাগে। মিউচুয়াল ফান্ড একসঙ্গে অনেক শেয়ার ধরে বলে অল্প টাকায় এটা সহজ করে।
- একই খাতে অনেক শেয়ার: পাঁচটা আলাদা কোম্পানি, কিন্তু সবগুলো একই খাতের হলে, খাতের একটা খারাপ খবরে সবগুলোই পড়তে পারে।
- একই জিনিসের কয়েকটা মোড়ক: কয়েকটা ফান্ড কিনলেন, কিন্তু সবগুলোর ভেতরে প্রায় একই শেয়ার। দেখতে ভাগ করা, আসলে একই ঝুড়ি।
- নিজের আয়ের সঙ্গে জড়ানো: যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, সঞ্চয়ের বড় অংশও সেখানে রাখলে, একটা সমস্যায় চাকরি আর সঞ্চয় একসঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ে।
আমেরিকার জ্বালানি কোম্পানি এনরনের কর্মীদের অবসর-সঞ্চয় পরিকল্পনার (৪০১(কে)) প্রায় ৬২% ছিল এনরনেরই শেয়ারে (২০০০ সালের শেষে)। আগস্ট ২০০০-এ প্রায় ৯০ ডলারের শেয়ার নভেম্বর ২০০১-এ নেমে আসে ৫ ডলারেরও নিচে, আর কোম্পানিটা দেউলিয়া হয়। অনেক কর্মী একসঙ্গে চাকরি আর অবসরের সঞ্চয় দুটোই হারান।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক আপনার কাছে ১,০০,০০০ টাকা। প্রথম উপায়ে পুরোটা একটা কোম্পানির শেয়ারে দিলেন। দ্বিতীয় উপায়ে পাঁচটা আলাদা খাতের পাঁচটা কোম্পানিতে ২০,০০০ টাকা করে দিলেন।
- একটা কোম্পানিতে বড় সমস্যা হলো, তার শেয়ারের দাম ৫০% পড়ল। বাকিগুলো ধরা যাক একই রইল।
- প্রথম উপায়ে ক্ষতি ৫০,০০০ টাকা, মানে পুরো টাকার ৫০%। দ্বিতীয় উপায়ে ক্ষতি ২০,০০০ টাকার ৫০% = ১০,০০০ টাকা, মানে পুরো টাকার ১০%।
ফল: একই খারাপ খবর, কিন্তু ক্ষতি পাঁচ ভাগের এক ভাগ। তবে মনে রাখুন, পুরো বাজার একসঙ্গে পড়লে পাঁচটাই পড়তে পারে; এজন্য অ্যাসেটের ধরনেও ভাগ করা দরকার হয়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| মোট ক্ষতি | |
|---|---|
| সব টাকা এক কোম্পানিতে | ৫০% |
| পাঁচ কোম্পানিতে ভাগ করে | ১০% |
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- অনেকগুলো শেয়ার কিনে ভাবা ডাইভারসিফাই হয়ে গেছে, অথচ সবগুলো একই খাতের।
- ডাইভারসিফিকেশন মানে সব রিস্ক চলে যাওয়া ভাবা। পুরো বাজারের পতন এতে এড়ানো যায় না।
- না বুঝে শুধু "ভাগ করার জন্য" এমন কিছুতে টাকা দেওয়া, যার রিস্ক আরও বেশি বা যা অনুমোদনহীন।
- এত জায়গায় অল্প অল্প করে ছড়ানো যে কোনটা কেন আছে, আর ফি কত লাগছে, তা আর খেয়াল থাকে না।
এমন কয়েকটা জিনিসে টাকা ভাগ করুন যেগুলো একসঙ্গে খারাপ হয় না; শুধু সংখ্যায় বেশি হলেই ডাইভারসিফিকেশন হয় না।