মানি ক্রিয়েশন কী
অনেকে ভাবেন, ব্যাংক শুধু জমাকারীদের টাকা নিয়ে অন্যদের ধার দেয়। আসল প্রক্রিয়াটা একটু অন্যরকম। ব্যাংক যখন কাউকে লোন দেয়, তখন সে ঋণগ্রহীতার অ্যাকাউন্টে নতুন একটা ব্যালান্স লিখে দেয়। কারও অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কমে না, অথচ অর্থনীতিতে খরচ করার মতো ডিপোজিট বাড়ে। এই নতুন ডিপোজিটও টাকা।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ২০১৪ সালের এক প্রকাশনায় এটা সরাসরি বলেছে: আধুনিক অর্থনীতিতে বেশিরভাগ টাকা তৈরি হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের লোন দেওয়ার মাধ্যমে। উল্টোটাও সত্য: লোন শোধ করলে সেই টাকা আবার "মুছে" যায়।
ধরা যাক করিম একটা পিকআপ ভ্যান কিনতে ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকা লোন নিলেন। ব্যাংক তাঁর অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ টাকা জমা দেখাল। কারও জমা কমেনি, কিন্তু দেশে খরচযোগ্য টাকা ৫ লাখ বাড়ল। করিম ভ্যান বিক্রেতাকে টাকা দিলে সেটা বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে যায়, কিন্তু মোট টাকা একই থাকে। সংখ্যা আর ঘটনা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- ইনফ্লেশন বুঝতে: লোন খুব দ্রুত বাড়লে টাকার জোগানও দ্রুত বাড়ে। পণ্য সেই হারে না বাড়লে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়।
- কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন রেট বদলায় বুঝতে: পলিসি রেট দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক লোনের খরচ বদলায়, আর এর মাধ্যমে কতটা নতুন টাকা তৈরি হবে তাতে প্রভাব ফেলে।
- ঋণের বুম চিনতে: লোন আর টাকার জোগান একসঙ্গে খুব দ্রুত বাড়লে অনেক সময় অ্যাসেটের দামও ফুলে ওঠে, আর পরে সংশোধন আসতে পারে।
- খবরের সংখ্যা পড়তে: "ব্রড মানি", "রিজার্ভ মানি", "প্রাইভেট সেক্টর ক্রেডিট গ্রোথ" কী বোঝায়, তা জানলে অর্থনীতির খবর পরিষ্কার হয়।
দুই রকম টাকা
প্রথমটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা: কাগজের নোট-কয়েন, আর ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে যে রিজার্ভ রাখে। এর মোট পরিমাণকে বলে রিজার্ভ মানি। দ্বিতীয়টা ব্যাংকের টাকা: আপনার সেভিংস, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট আর এফডিআরের ব্যালান্স। নোট আর সব ডিপোজিট মিলিয়ে হয় ব্রড মানি বা এম২।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে নভেম্বর ২০২৫-এর শেষে ব্রড মানি ছিল প্রায় ২২.২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকা প্রায় ২.৬৯ লাখ কোটি, মানে মাত্র ১২%-এর মতো; বাকি প্রায় ৮৮% ব্যাংক ডিপোজিট। জুন ২০২৬-এ ব্যাংকের বাইরে নগদের অংশ ছিল প্রায় ১৪%। অর্থাৎ দেশের টাকার বড় অংশই ব্যাংকের খাতায় লেখা সংখ্যা।
সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, সিলেক্টেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| ব্যাংকের বাইরে নগদ | ব্যাংকে আমানত | |
|---|---|---|
| ব্রড মানি | ১২ | ৮৮ |
মানি মাল্টিপ্লায়ার: পাঠ্যবই আর বাস্তবতা
পাঠ্যবইয়ে প্রায়ই দেখানো হয়: ব্যাংক জমার একটা অংশ রিজার্ভ রাখে, বাকিটা লোন দেয়, সেই লোন আবার কোথাও জমা হয়, এভাবে চক্রে টাকা কয়েক গুণ হয়। একে বলে মানি মাল্টিপ্লায়ার। বাংলাদেশ ব্যাংক এই অনুপাত (ব্রড মানি ÷ রিজার্ভ মানি) প্রকাশ করে; নভেম্বর ২০২৫-এ তা ছিল ৫.৪৮।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বলছে, বাস্তবে ক্রমটা প্রায়ই উল্টো: ব্যাংক আগে লোন দেয়, তাতে ডিপোজিট তৈরি হয়, তারপর দরকারি রিজার্ভ জোগাড় করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভের পরিমাণের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে তার "দাম", মানে পলিসি রেট। তাই মাল্টিপ্লায়ারকে একটা যান্ত্রিক নিয়মের চেয়ে বরং ফলাফলের একটা মাপ হিসেবে দেখা ভালো।
কী টাকা তৈরি সীমিত রাখে
- মুনাফা আর ঝুঁকি: ব্যাংক শুধু তাকেই লোন দিতে চায়, যে ফেরত দিতে পারবে বলে মনে হয়। খারাপ লোন দিলে ক্ষতি ব্যাংকের নিজের।
- লোনের চাহিদা: সুদ বেশি হলে বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে মানুষ আর ব্যবসা কম ধার নেয়।
- নিয়ম-কানুন: মূলধনের শর্ত, সিআরআর আর এসএলআরের মতো নিয়ম ব্যাংককে লাগামহীন লোন দিতে দেয় না। যেমন এপ্রিল ২০২০-এ সিআরআর ৫% থেকে ৪% করায় ব্যাংকগুলোর হাতে প্রায় ১২,৮০০ কোটি টাকার বাড়তি তারল্য আসবে বলে জানানো হয়েছিল।
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি: পলিসি রেট বাড়ালে লোন দামি হয়, টাকা তৈরির গতি কমে; কমালে উল্টো।
হাতে-কলমে হিসাব
- শুরুতে ধরা যাক দেশে মোট টাকা (নোট + ডিপোজিট) ১,০০০ একক। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
- ব্যাংক করিমকে ৫ একক লোন দিল, তাঁর অ্যাকাউন্টে ৫ একক নতুন ডিপোজিট। মোট টাকা এখন ১,০০৫।
- করিম ভ্যান বিক্রেতাকে ৫ একক দিলেন। টাকা এক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক অ্যাকাউন্টে গেল; মোট এখনও ১,০০৫।
- কয়েক বছর পরে করিম লোনের আসল ৫ একক শোধ করলেন। তাঁর ডিপোজিট থেকে ৫ একক কমল, লোনও শেষ। মোট টাকা আবার ১,০০০।
ফল: লোন দিলে টাকা তৈরি হয়, শোধ করলে মুছে যায়। তাই নতুন লোন যদি শোধের চেয়ে দ্রুত বাড়ে, দেশে টাকার জোগান বাড়ে; উল্টোটা হলে কমে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ভাবা যে ব্যাংক ঠিক জমাকারীদের টাকাটাই হুবহু অন্যদের ধার দেয়, আর নতুন কোনো টাকা তৈরি হয় না।
- ভাবা যে দেশের সব টাকা সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাপায়। নোট ছাপায় ঠিকই, কিন্তু টাকার বড় অংশ ব্যাংক ডিপোজিট।
- টাকা বেশি মানেই দেশ বেশি ধনী, এমন ভাবা। পণ্য আর সেবা না বাড়লে বাড়তি টাকা শুধু দাম বাড়ায়।
- ধরে নেওয়া যে ব্যাংক ইচ্ছেমতো সীমাহীন টাকা বানাতে পারে। মুনাফা, ঝুঁকি, নিয়ম আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি এটাকে সীমিত রাখে।
দেশের বেশিরভাগ টাকা ব্যাংক ডিপোজিট, আর তা তৈরি হয় লোন দেওয়ার মাধ্যমে, মুছে যায় লোন শোধে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেট দিয়ে এই গতি নিয়ন্ত্রণ করে।