গ্রোথ ইনভেস্টিং কী
গ্রোথ ইনভেস্টিং মানে এমন কোম্পানি খোঁজা যাদের বিক্রি আর মুনাফা সামনের বছরগুলোতে বাজারের গড়ের চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়তে পারে। নতুন বাজার ধরছে, নতুন পণ্য আনছে বা দ্রুত বড় হচ্ছে এমন ব্যবসা। এরা অনেক সময় মুনাফার বড় অংশ ডিভিডেন্ড না দিয়ে ব্যবসা বাড়াতেই আবার খাটায়।
এমন শেয়ারের দাম সাধারণত আজকের আয়ের তুলনায় বেশি থাকে, কারণ ক্রেতারা ভবিষ্যতের বড় আয়ের দাম আগেই দিয়ে দিচ্ছেন। গ্রোথ ইনভেস্টর তাই একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন: এই প্রবৃদ্ধি কি সত্যিই আসবে, আর আজকের দাম কি তার চেয়েও বেশি আশা ধরে নিয়েছে?
ধরা যাক মহল্লায় দুটো দোকান বিক্রি হচ্ছে। একটা পুরোনো মুদি দোকান, বছরে মুনাফা ১ লাখ টাকা, দাম চাওয়া হচ্ছে ৮ লাখ। আরেকটা নতুন অনলাইন ডেলিভারির ব্যবসা, এখন মুনাফা মাত্র ৫০,০০০ টাকা, কিন্তু প্রতি বছর দ্বিগুণ হচ্ছে, দাম চাওয়া হচ্ছে ১০ লাখ। দ্বিতীয়টা কেনা মানে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির ওপর বাজি ধরা: প্রবৃদ্ধি চললে দামটা সস্তা মনে হবে, থেমে গেলে অনেক বেশি। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- উচ্চ পি/ই কেন হয় বুঝতে: বেশি পি/ই মানেই "দামি তাই খারাপ" নয়, আবার "ভালো কোম্পানি তাই যেকোনো দাম ঠিক" নয়।
- প্রত্যাশার রিস্ক চিনতে: গ্রোথ শেয়ারের দামে অনেক আশা ঢোকানো থাকে; আশা একটু কমলেই দাম অনেক পড়তে পারে।
- গল্প আর হিসাব আলাদা করতে: "এটাই ভবিষ্যৎ" শুনে কেনার আগে দেখা দরকার আয় আসলে বাড়ছে কি না।
- ডিভিডেন্ড কম কেন বুঝতে: যারা মুনাফা ব্যবসায় খাটায়, তাদের কাছ থেকে নিয়মিত আয় কম আসে; রিটার্ন মূলত দামের ওপর নির্ভর।
প্রবৃদ্ধির জন্য কতটা দাম দেওয়া যায়
একটা কোম্পানি ভালো, আর একটা শেয়ার ভালো কেনা, দুটো আলাদা কথা। যে কোম্পানির আয় বছরে ২০% বাড়ছে, তার শেয়ার যদি ইতিমধ্যে এমন দামে থাকে যেন আয় বছরে ৪০% বাড়বে, তবে কোম্পানি ভালো করলেও শেয়ারের দাম পড়তে পারে।
এই কারণে গ্রোথ শেয়ার খবরের প্রতি খুব সংবেদনশীল। আয়ের ফল প্রত্যাশার চেয়ে একটু কম এলেই, বা সুদের হার বাড়লে, দাম বড় ধাক্কা খেতে পারে। সুদের হার বাড়লে দূর ভবিষ্যতের আয়ের আজকের মূল্য কমে যায়, আর গ্রোথ শেয়ারের মূল্যের বড় অংশই দূর ভবিষ্যতের আয়।
ইতিহাসের শিক্ষা: ডট-কম বাবল
১৯৯০-এর দশকের শেষে ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোকে ঘিরে আমেরিকায় প্রচণ্ড উৎসাহ তৈরি হয়। প্রযুক্তি কোম্পানির সূচক নাসড্যাক কম্পোজিট ১০ মার্চ ২০০০-এ প্রায় ৫,১৩২ পয়েন্টে ওঠে, তারপর অক্টোবর ২০০২-এর মধ্যে প্রায় ৭৮% পড়ে যায়। আগের সর্বোচ্চে ফিরতে সূচকটির প্রায় ১৫ বছর লাগে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত।
ইন্টারনেট সত্যিই পৃথিবী বদলে দিয়েছে; ভুলটা ছিল দামে। অনেক কোম্পানির মুনাফা ছিল না, কিছু পরে বন্ধও হয়ে যায়। শিক্ষা: একটা খাত বড় হবে, এটা ঠিক হলেও, কোন কোম্পানি জিতবে আর আজ কত দাম যৌক্তিক, সেটা আলাদা প্রশ্ন।
গ্রোথ ইনভেস্টররা কী দেখেন
- বিক্রি আর মুনাফা কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে কি না, শুধু এক বছরের লাফ নয়।
- প্রবৃদ্ধি কোথা থেকে আসছে: নতুন গ্রাহক, নতুন বাজার, নাকি শুধু ধার করে বড় হওয়া।
- প্রতিযোগীরা সহজে নকল করতে পারবে কি না, আর পরিচালনা স্বচ্ছ কি না।
- আজকের দাম কতটা প্রবৃদ্ধি ধরে নিয়েছে, আর সেটা বাস্তবসম্মত কি না।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা শেয়ারের দাম ১৫০ টাকা, শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ৫ টাকা। পি/ই = ১৫০ ÷ ৫ = ৩০।
- আশা অনুযায়ী আয় পাঁচ বছর ধরে বছরে ২০% বাড়লে ইপিএস হবে প্রায় ১২.৪৪ টাকা। তখন ১৫০ টাকা দাম মানে পি/ই মাত্র ১২-র মতো; আজকের দামটা তখন যৌক্তিক মনে হবে।
- কিন্তু প্রবৃদ্ধি যদি বছরে মাত্র ৫% হয়, ইপিএস হবে প্রায় ৬.৩৮ টাকা। হতাশ বাজার তখন পি/ই ১৫ দিলে দাম হবে প্রায় ৯৬ টাকা।
ফল: কোম্পানির আয় বাড়লেও শেয়ারের দাম ১৫০ থেকে প্রায় ৯৬ টাকায় নামতে পারে, শুধু প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায়। গ্রোথ শেয়ারে রিস্ক হলো বেশি আশার দাম দেওয়া। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "ভালো কোম্পানি" আর "ভালো দাম" এক ভেবে ফেলা।
- অতীতের দ্রুত দাম বাড়াকে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির প্রমাণ ধরা।
- আয় না দেখে শুধু গল্প, খবর বা গুজবে কেনা।
- ধরে নেওয়া যে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অনির্দিষ্টকাল চলবে। প্রতিযোগিতা আর বাজারের আকার একসময় গতি কমায়।
গ্রোথ ইনভেস্টিংয়ে আপনি ভবিষ্যতের দাম আজ দেন: প্রবৃদ্ধি এলেও, দাম যদি তার চেয়ে বেশি আশা ধরে রাখে, লোকসান হতে পারে।