প্যাসিভ ইনভেস্টিং কী
একটা স্টক ইনডেক্স বা সূচক হলো বাছাই করা কিছু শেয়ারের একটা তালিকা, যার গড় দাম দিয়ে বাজার উঠছে না নামছে বোঝা যায়। যেমন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স, আর ৩০টি বড় কোম্পানি নিয়ে ডিএস৩০, দুটোই জানুয়ারি ২০১৩ থেকে চালু।
প্যাসিভ ইনভেস্টিং মানে কোনো সূচকের শেয়ারগুলো একই অনুপাতে কিনে রাখা, সাধারণত একটা ইনডেক্স ফান্ড বা ইনডেক্স-ভিত্তিক ইটিএফের মাধ্যমে। ফান্ড ম্যানেজার কোন শেয়ার ভালো তা বিচার করেন না, শুধু সূচকটা অনুসরণ করেন। এর উল্টো হলো অ্যাকটিভ ইনভেস্টিং, যেখানে ম্যানেজার বা আপনি নিজে বাজারকে হারানোর আশায় শেয়ার বাছাই করেন।
ধরা যাক ক্রিকেটের ফ্যান্টাসি লিগে আপনি সেরা ১১ জন বাছাইয়ের চেষ্টা না করে, পুরো লিগের সব খেলোয়াড়ের গড় পারফরম্যান্স নিলেন। আপনি কখনো সবার ওপরে থাকবেন না, আবার একেবারে নিচেও না। আর বছরের শেষে দেখা গেল, যারা প্রতি সপ্তাহে দল বদলাতে গিয়ে পয়েন্ট খরচ করেছে, তাদের বেশিরভাগ আপনার নিচে। প্যাসিভ ইনভেস্টিংয়ের ভাবনা এটাই।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- খরচ কম: শেয়ার বাছাইয়ের গবেষণা আর ঘন ঘন কেনাবেচা লাগে না, তাই ফি সাধারণত অ্যাকটিভ ফান্ডের চেয়ে কম। লম্বা সময়ে এই পার্থক্য অনেক বড় হয়।
- ডাইভারসিফিকেশন সহজে: একটা ফান্ডেই অনেক কোম্পানি, তাই এক কোম্পানির বিপদে পুরো টাকা ঝুঁকিতে পড়ে না।
- বাজারকে হারানো কঠিন: অভিজ্ঞ পেশাদার ম্যানেজারদের বেশিরভাগও লম্বা সময়ে সূচককে হারাতে পারেন না।
- আবেগ কম: কোন শেয়ার কিনব-বেচব, প্রতিদিন সেই সিদ্ধান্তের চাপ থাকে না।
অ্যাকটিভ ফান্ড কেমন করে
এসঅ্যান্ডপি ডাও জোনস ইনডিসেস প্রতি ছয় মাসে "স্পিভা" নামে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে অ্যাকটিভ ফান্ডকে তাদের তুলনীয় সূচকের সঙ্গে মেলানো হয়। ২০২৫ সালে আমেরিকার বড় কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা অ্যাকটিভ ফান্ডের ৭৯% এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের চেয়ে কম রিটার্ন দিয়েছে; ২০২৪-এ এই হার ছিল ৬৫%। ২০২৫ পর্যন্ত পাঁচ বছরের হিসাবে ৮৯%।
সময় যত লম্বা, সূচককে হারাতে না পারা ফান্ডের হার সাধারণত তত বেশি। কারণ সহজ: সব ইনভেস্টর মিলে গড়ে বাজারের রিটার্নই পায়, তারপর অ্যাকটিভ ফান্ডের বাড়তি ফি আর লেনদেন খরচ বাদ যায়। তবে এগুলো মূলত বিদেশি বাজারের তথ্য; বাংলাদেশের বাজার ছোট, আর এখানকার ফলাফল আলাদা হতে পারে।
সূত্র: এসঅ্যান্ডপি ডাও জোন্স ইনডিসেস, SPIVA, ২০২৬
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| পিছিয়ে থাকা ফান্ড | |
|---|---|
| ২০২৪ সালে | ৬৫% |
| ২০২৫ সালে | ৭৯% |
| পাঁচ বছরে | ৮৯% |
বাংলাদেশে অবস্থা
বাংলাদেশে ইটিএফের নিয়মকানুন ২০১৭ সালে তৈরি হলেও বাস্তবে খুব ধীরে এগিয়েছে। ২০২১ সালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, দেশে তখনো কোনো ইটিএফ চালু হয়নি আর ইনডেক্স ফান্ডের জন্য আলাদা নিয়মও ছিল না। ২০২৩ সালে প্রথম একটা ইটিএফ অনুমোদন পেলেও জুন ২০২৪ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীর আগ্রহের অভাবে তা চালু হয়নি।
তাই দেশে সরাসরি "সূচক কেনা"র সুযোগ এখনো সীমিত। নতুন ফান্ড চালু হলে বিএসইসি আর স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ তথ্য দেখে নেওয়া ভালো। অনেক বাংলাদেশি ইনভেস্টর তবু প্যাসিভ ভাবনার মূল কথাগুলো কাজে লাগাতে পারেন: খরচ কম রাখা, অনেক কোম্পানিতে ছড়িয়ে রাখা, আর ঘন ঘন কেনাবেচা এড়ানো।
প্যাসিভের সীমাবদ্ধতা
- সূচকও পড়ে: প্যাসিভ মানে নিরাপদ নয়। ২০২০ সালের প্রথম তিন মাসে ডিএসইএক্স প্রায় ১৯% পড়েছিল।
- সূচকে যা আছে আপনিও তাই কিনবেন: কোনো খাত বা কোম্পানির দাম অতিরিক্ত বেড়ে গেলেও সূচক তা ধরে রাখে।
- ছোট বা কেন্দ্রীভূত বাজারে সূচক কয়েকটা বড় কোম্পানির ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে, তাই ডাইভারসিফিকেশন যতটা মনে হয় ততটা না-ও হতে পারে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক দুটো ফান্ড একই বাজারে, ফি-এর আগে দুটোই বছরে গড়ে ১০% রিটার্ন পায়। ইনভেস্ট করলেন ১,০০,০০০ টাকা, রেখে দিলেন ২০ বছর।
- ফান্ড ক-এর বার্ষিক খরচ ০.৫%: নিট রিটার্ন ৯.৫%। ২০ বছর পরে প্রায় ৬,১৪,০০০ টাকা।
- ফান্ড খ-এর বার্ষিক খরচ ২.৫%: নিট রিটার্ন ৭.৫%। ২০ বছর পরে প্রায় ৪,২৫,০০০ টাকা।
ফল: বছরে মাত্র ২% বেশি খরচ, কিন্তু ২০ বছরে পার্থক্য প্রায় ১,৮৯,০০০ টাকা, আপনার মূল টাকার প্রায় দ্বিগুণ। শুধু সমান থাকতেই বেশি ফি-এর ফান্ডকে প্রতি বছর অন্তত ২% বেশি রিটার্ন আনতে হবে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- প্যাসিভকে "লোকসান হয় না" ভাবা। সূচক পড়লে ইনডেক্স ফান্ডও পড়ে।
- শুধু গত বছরের সেরা অ্যাকটিভ ফান্ড দেখে ধরে নেওয়া যে সামনেও সেটাই সেরা থাকবে।
- ফি-কে ছোট সংখ্যা ভেবে উপেক্ষা করা। লম্বা সময়ে ফি-ই রিটার্নের বড় অংশ খেয়ে ফেলতে পারে।
- ইনডেক্স ফান্ড কিনে বাজার পড়লেই বেচে দেওয়া। প্যাসিভ পদ্ধতি কাজ করে লম্বা সময় ধরে রাখলে।
বাজারকে হারানো খুব কঠিন, কিন্তু খরচ কম রাখা আপনার হাতে: প্যাসিভ ইনভেস্টিং মানে কম খরচে পুরো বাজারের রিটার্ন নেওয়া, ঝুঁকিসহ।