কুপন আর ইল্ড কী
কুপন রেট হলো ফেস ভ্যালুর ওপর বছরে কত সুদ দেওয়া হবে। ১ লাখ টাকা ফেস ভ্যালুর বন্ডে কুপন ১০% মানে বছরে ১০,০০০ টাকা সুদ, বন্ডটা যার হাতেই থাকুক, যে দামেই কেনা হোক। নির্দিষ্ট কুপনের বন্ডে বাজারের সুদ বাড়লে-কমলেও এই অঙ্ক একই থাকে।
ইল্ড প্রশ্ন করে: আমি যে টাকা দিয়েছি, তার ওপর রিটার্ন কত? বন্ড সবসময় ফেস ভ্যালুতে কেনাবেচা হয় না। কম দামে কিনলে একই ১০,০০০ টাকা সুদ আপনার দেওয়া টাকার তুলনায় বেশি, তাই ইল্ড কুপনের চেয়ে বেশি। বেশি দামে কিনলে উল্টো।
ধরা যাক একটা দোকানঘর থেকে মাসে ১০,০০০ টাকা ভাড়া আসে, ভাড়াটা চুক্তিতে বাঁধা। শফিক দোকানটা কিনলেন ১০ লাখ টাকায়, আর তাঁর বন্ধু পাশের একই রকম দোকান কিনলেন ৮ লাখে। ভাড়া দুজনেরই সমান (এটা "কুপন"), কিন্তু বন্ধুর দেওয়া টাকার তুলনায় ভাড়াটা বেশি, তাই তাঁর রিটার্ন বা "ইল্ড" বেশি। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- বন্ড তুলনা করতে: ভিন্ন কুপন, ভিন্ন দাম আর ভিন্ন মেয়াদের বন্ড পাশাপাশি রাখার সাধারণ মাপকাঠি হলো ইল্ড টু ম্যাচিউরিটি।
- খবর বুঝতে: "ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বেড়েছে" মানে নতুন ধারে সরকারকে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে, আর পুরোনো বন্ডের দাম কমেছে।
- উঁচু কুপনের ফাঁদ এড়াতে: কুপন বেশি হলেও বন্ডটা যদি ফেস ভ্যালুর অনেক বেশি দামে কেনেন, আসল রিটার্ন কুপনের চেয়ে কম হবে।
- অন্য সঞ্চয়ের সঙ্গে মেলাতে: এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রের হারের সঙ্গে তুলনা করতে হবে বন্ডের ইল্ড, কুপন নয়।
তিনটি হার, তিনটি প্রশ্ন
- কুপন রেট: ফেস ভ্যালুর ওপর বছরে কত সুদ? বন্ড ইস্যুর দিন ঠিক হয়, আর নির্দিষ্ট কুপনের বন্ডে পরে বদলায় না।
- কারেন্ট ইল্ড: আজকের বাজারদামের তুলনায় বছরের কুপন কত শতাংশ? হিসাব সহজ: বছরের কুপন ÷ বাজারদাম। তবে এতে মেয়াদ শেষে ফেস ভ্যালু ফেরত পাওয়ার লাভ-ক্ষতি ধরা হয় না।
- ইল্ড টু ম্যাচিউরিটি (ওয়াইটিএম): আজকের দামে কিনে মেয়াদ পর্যন্ত রাখলে বছরে মোট রিটার্ন কত? এতে সব কুপন আর কেনা দাম ও ফেস ভ্যালুর পার্থক্য, দুটোই ধরা হয়। ধরে নেওয়া হয় ইস্যুকারী সব টাকা ঠিকমতো দেবে।
প্রিমিয়াম আর ডিসকাউন্ট
বন্ডের দাম ফেস ভ্যালুর বেশি হলে বলা হয় প্রিমিয়ামে কেনাবেচা হচ্ছে; কম হলে ডিসকাউন্টে। সাধারণত বাজারের সুদের হার বন্ডের কুপনের চেয়ে কম হলে বন্ডটা প্রিমিয়ামে থাকে, কারণ ক্রেতারা ওই বেশি কুপনের জন্য বাড়তি দাম দিতে রাজি।
নিয়মটা মনে রাখার সহজ উপায়: দাম আর ইল্ড উল্টো দিকে চলে। ডিসকাউন্টে কিনলে ইল্ড কুপনের চেয়ে বেশি, কারণ মেয়াদ শেষে কেনা দামের চেয়ে বেশি টাকা ফেরত আসে। প্রিমিয়ামে কিনলে ইল্ড কুপনের চেয়ে কম, কারণ শেষে কেনা দামের চেয়ে কম ফেরত আসে।
বাংলাদেশের খবরে ইল্ড
বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের হয়ে ট্রেজারি বিল আর বন্ডের নিলাম করে। খবরে যে "কাট-অফ ইল্ড" দেখেন, সেটা ওই নিলামে সরকার যে সর্বোচ্চ ইল্ডে টাকা নিয়েছে। এটা সময়ের সঙ্গে অনেক বদলায়: এপ্রিল ২০২১-এর এক নিলামে ১৫ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ছিল ৫.৮৭% আর ২০ বছরের ৬.৬৪%; আর মার্চ ২০২৫-এ ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড আগের ১০.৩২% থেকে উঠে ১২.০৫% হয়।
ভাবুন ২০২১ সালে যিনি প্রায় ৬% কুপনের লম্বা মেয়াদি বন্ড কিনেছিলেন। ২০২৫ সালে নতুন বন্ড যখন ১২%-এর কাছে দিচ্ছে, তাঁর বন্ড বাজারে বেচতে হলে দাম অনেক কমাতে হতো, যাতে নতুন ক্রেতার ইল্ড বাজারের সমান হয়। কুপন একই, ইল্ড বাজারের সঙ্গে সরে গেছে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ১,০০,০০০ টাকা ফেস ভ্যালুর বন্ড, কুপন বছরে ১০% (১০,০০০ টাকা, বছরে একবার), মেয়াদ বাকি ২ বছর। আপনি বাজার থেকে কিনলেন ৯৬,০০০ টাকায়।
- কারেন্ট ইল্ড = ১০,০০০ ÷ ৯৬,০০০ ≈ ১০.৪%। কুপনের চেয়ে একটু বেশি, কারণ কম দামে কিনেছেন।
- মেয়াদ শেষে পাবেন ১,০০,০০০ টাকা, মানে কেনা দামের চেয়ে ৪,০০০ টাকা বেশি। দুই বছরের কুপন আর এই ৪,০০০ টাকা মিলিয়ে ইল্ড টু ম্যাচিউরিটি দাঁড়ায় বছরে প্রায় ১২.৪%।
ফল: কুপন ১০%, কিন্তু এই দামে কিনে মেয়াদ পর্যন্ত রাখলে রিটার্ন প্রায় ১২.৪%, যদি ইস্যুকারী সব টাকা দেয়। একই বন্ড ১,০৪,০০০ টাকায় কিনলে ইল্ড হতো কুপনের চেয়ে কম। কর বাদ দিয়ে, সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- কুপনকেই রিটার্ন ভাবা, আর কত দামে কিনছেন তা না দেখা।
- বেশি কুপন দেখে প্রিমিয়ামে কিনে ভাবা রিটার্নও তত বেশি।
- শুধু কারেন্ট ইল্ড দেখা। মেয়াদ শেষে ফেস ভ্যালু ফেরতের লাভ বা ক্ষতি তাতে ধরা নেই।
- বেশি ইল্ড মানেই ভালো ধরে নেওয়া। অনেক সময় বেশি ইল্ড মানে বাজার ইস্যুকারীর টাকা ফেরত নিয়ে বেশি সন্দেহ করছে।
কুপন বলে বন্ড কত সুদ দেয়; ইল্ড বলে আপনার দেওয়া দামে আসলে কত পাচ্ছেন। তুলনা করুন ইল্ড টু ম্যাচিউরিটি দিয়ে, আর মনে রাখুন দাম কমলে ইল্ড বাড়ে।