বোনাস আর রাইট শেয়ার কী
বোনাস শেয়ার (স্টক ডিভিডেন্ড) মানে কোম্পানি নগদ টাকার বদলে শেয়ারহোল্ডারদের বিনা মূল্যে বাড়তি শেয়ার দেয়। "১০% বোনাস" মানে প্রতি ১০টা শেয়ারে ১টা নতুন শেয়ার। কোম্পানির হাতে নতুন কোনো টাকা আসে না, কোম্পানি থেকে কোনো টাকা বেরও হয় না; জমানো মুনাফাটা হিসাবের খাতায় শেয়ার মূলধনে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাই কোম্পানির মোট মূল্য একই থাকে, শুধু টুকরোর সংখ্যা বাড়ে।
রাইট শেয়ার মানে কোম্পানি নতুন টাকা তুলতে নতুন শেয়ার ছাড়ে, আর প্রথম সুযোগটা দেয় বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের, তাঁদের শেয়ারের অনুপাতে, সাধারণত বাজারদামের চেয়ে কম দামে। "১:২ রাইট" মানে প্রতি ২টা শেয়ারের জন্য ১টা নতুন শেয়ার কেনার অধিকার। এখানে টাকা দিতে হয়, আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না দিলে সুযোগটা চলে যায়।
ধরা যাক একটা বড় পিৎজা ৮ টুকরো করা, আপনার ভাগে ২ টুকরো। কেউ এসে পিৎজাটা ১৬ টুকরো করে দিল, এখন আপনার ৪ টুকরো। টুকরো দ্বিগুণ, কিন্তু খাবার একই, পিৎজার এক-চতুর্থাংশই। বোনাস শেয়ার এরকম। রাইট শেয়ার হলো: দোকানদার বলল, পিৎজা বড় করা হবে, কিন্তু তার জন্য প্রত্যেককে কিছু টাকা দিতে হবে; যে দেবে না, তার ভাগ বড় পিৎজায় ছোট হয়ে যাবে।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- "ফ্রি শেয়ার"-এর ভুল না করতে: বোনাসের পর দাম সেই অনুপাতে সমন্বয় হয়, তাই আপনার মোট মূল্য প্রায় একই থাকে।
- রাইট শেয়ারে সিদ্ধান্ত নিতে: না কিনলে আপনার মালিকানার ভাগ কমে, আর দাম সমন্বয়ে আপনার শেয়ারের মূল্যও কমতে পারে।
- টাকা কোথায় যাচ্ছে বুঝতে: বোনাস দিলে কোম্পানির নগদ টাকা থেকে যায়; রাইট শেয়ারে ইনভেস্টরদের কাছ থেকে নতুন টাকা নেওয়া হয়। দুটো ক্ষেত্রেই কারণটা জানা দরকার।
- ঠিক হিসাব রাখতে: শেয়ারের সংখ্যা বা খরচ বদলালে প্রতি শেয়ারের খরচও বদলায়, আর তাতে লাভ-লোকসানের হিসাবও বদলায়।
দাম কেন সমন্বয় হয়
রেকর্ড ডেটের পরে এক্সচেঞ্জ শেয়ারের দাম সমন্বয় করে, কারণ কোম্পানির মূল্য একই থাকলেও শেয়ার বেড়েছে। বোনাসের ক্ষেত্রে সমন্বিত দাম ≈ আগের দাম ÷ (১ + বোনাসের হার)। ধরা যাক ৬৬ টাকার শেয়ারে ১০% বোনাস: ৬৬ ÷ ১.১ = ৬০ টাকা। ১০০টা শেয়ার × ৬৬ = ৬,৬০০ টাকা; ১১০টা × ৬০ = ৬,৬০০ টাকা। মোট একই।
রাইট শেয়ারে নতুন টাকা ঢোকে, তাই সমন্বিত দাম পুরোনো দাম আর রাইটের দামের গড়ের মতো: (পুরোনো শেয়ার × বাজারদাম + নতুন শেয়ার × রাইটের দাম) ÷ মোট শেয়ার। একে বলে থিওরেটিক্যাল এক্স-রাইট প্রাইস। এরপর দাম বাজারের চাহিদা-জোগানে ওঠানামা করে, সমন্বিত দামে আটকে থাকে না।
বাংলাদেশে নিয়ম (বদলাতে পারে)
- বোনাস শেয়ারে বিএসইসির অনুমতি: ৩১ আগস্ট ২০২১ থেকে কার্যকর নির্দেশনায় কিছু ক্ষেত্রে বোনাস দিতে বিএসইসির সম্মতি লাগে, যেমন তালিকাভুক্তির পর প্রথম তিন বছর, পরপর দুই বছর ১০%-এর কম নগদ লভ্যাংশ দিলে, বা নির্দিষ্ট শর্তে Z ক্যাটাগরির কোম্পানি হলে। বোনাসের কারণ হতে হবে সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন বা লাভজনক পুনর্বিনিয়োগ।
- কোম্পানির ওপর কর: ২০১৯–২০ অর্থবছরের অর্থ আইনে নিয়ম করা হয় যে কোনো বছর নগদের চেয়ে বেশি স্টক ডিভিডেন্ড দিলে কোম্পানিকে বাড়তি ১০% কর দিতে হবে, যাতে শুধু বোনাস দিয়ে নগদ ধরে রাখার প্রবণতা কমে। এ ধরনের কর প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে।
- রাইট শেয়ারে অনুমোদন: রাইট ইস্যুর জন্য কোম্পানিকে বিএসইসির অনুমোদন নিতে হয় আর প্রসপেক্টাসে টাকা তোলার কারণ, দাম আর সময়সূচি জানাতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে অধিকারটা অন্যকে হস্তান্তর করা যায়; সে সুযোগ আছে কি না, প্রসপেক্টাসে লেখা থাকে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক আপনার ১,০০০ শেয়ার, বাজারদাম ৩০ টাকা: মোট ৩০,০০০ টাকা। কোম্পানি ১:২ রাইট দিল, শেয়ারপ্রতি ১০ টাকায়। আপনি ৫০০টা নতুন শেয়ার কিনতে পারেন, খরচ ৫,০০০ টাকা।
- সমন্বিত দাম: (২ × ৩০ + ১ × ১০) ÷ ৩ ≈ ২৩.৩৩ টাকা।
- কিনলে: ১,৫০০ শেয়ার × ২৩.৩৩ ≈ ৩৫,০০০ টাকা, যা আপনার আগের ৩০,০০০ আর নতুন দেওয়া ৫,০০০ টাকার সমান। না কিনলে: ১,০০০ শেয়ার × ২৩.৩৩ ≈ ২৩,৩৩০ টাকা।
ফল: রাইট কিনে আপনি লাভ করেননি, শুধু আগের অবস্থান ধরে রেখেছেন আর বাড়তি টাকা ঢেলেছেন। না কিনলে, অধিকারটা অন্যকে হস্তান্তর করা না গেলে, কাগজে প্রায় ৬,৬৭০ টাকার মূল্য কমেছে। রাইট শেয়ারের আসল প্রশ্ন তাই "সস্তা কি না" নয়, কোম্পানি নতুন টাকা দিয়ে কী করবে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- বোনাস শেয়ারকে বাড়তি আয় ভাবা, যদিও দাম সেই অনুপাতে কমে।
- বোনাসের পর দাম কমা দেখে আতঙ্কিত হওয়া, অথচ মোট মূল্য প্রায় একই।
- বাজারদামের চেয়ে কম বলে রাইট শেয়ারকে "সস্তা" বা লাভজনক ধরে নেওয়া।
- রাইট শেয়ারের সময়সীমা খেয়াল না করা, ফলে না জেনেই মূল্য হারানো।
বোনাস আর রাইট শেয়ারে কোম্পানির পিৎজা বড় হয় না, শুধু টুকরো বা মালিকানার ভাগ বদলায়; আসল প্রশ্ন হলো কোম্পানি নিজের টাকা বা আপনার নতুন টাকা দিয়ে কী করছে।