ম্যানেজমেন্ট যাচাই কী
একটা লিস্টেড কোম্পানির মালিক হাজার হাজার শেয়ারহোল্ডার, কিন্তু প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত নেয় পরিচালনা পর্ষদ (বোর্ড অব ডিরেক্টরস) আর এমডি বা সিইও-র নেতৃত্বে ম্যানেজমেন্ট। কোথায় টাকা খাটানো হবে, কত ডিভিডেন্ড দেওয়া হবে, কত ধার নেওয়া হবে, হিসাব কীভাবে দেখানো হবে, সবই তাঁদের হাতে।
মালিক আর পরিচালকের স্বার্থ সব সময় এক হয় না। ম্যানেজমেন্ট যাচাই মানে খোঁজা: তাঁরা কি দক্ষ, তাঁরা কি সৎ, আর তাঁরা কি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের স্বার্থ মাথায় রেখে কাজ করেন।
ধরা যাক আপনি ঢাকায় চাকরি করেন, আর গ্রামের মাছের পুকুরটা দেখাশোনার জন্য একজন ম্যানেজার রেখেছেন। আপনি প্রতিদিন যেতে পারেন না, তাই বিচার করেন হিসাবের খাতা, আগের কথা আর কাজের মিল, মাছ বিক্রির টাকা ঠিকমতো আসছে কি না, আর তিনি নিজের আত্মীয়ের কাছ থেকে বেশি দামে খাবার কিনছেন কি না দেখে। শেয়ারহোল্ডারের অবস্থাও ঠিক এমন। উদাহরণটি কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- মুনাফা কোথায় যাবে, তা ম্যানেজমেন্ট ঠিক করে: ভালো জায়গায় খাটালে মূল্য বাড়ে, খারাপ জায়গায় খাটালে নষ্ট হয়।
- আপনি যে হিসাব পড়ছেন, তা তাঁদেরই তৈরি: সৎ ম্যানেজমেন্ট না হলে ভালো সংখ্যাও ভুল পথে নিতে পারে।
- রিলেটেড পার্টি লেনদেনের মাধ্যমে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের টাকা অন্যদিকে সরে যেতে পারে।
- তবে ব্যবসার মৌলিক অবস্থাই বেশি জরুরি: বাফেটের কথায়, দুর্দান্ত খ্যাতির ম্যানেজমেন্ট যখন দুর্বল অর্থনীতির কোনো ব্যবসায় হাত দেয়, তখন অটুট থাকে ব্যবসাটার খ্যাতিই।
কী কী দেখবেন
- কথা আর কাজের মিল: কয়েক বছর আগের অ্যানুয়াল রিপোর্টে যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল (নতুন কারখানা, নতুন পণ্য), পরে তা কতটা হয়েছে।
- মুনাফার ব্যবহার: যে মুনাফা ডিভিডেন্ড হিসেবে না দিয়ে রেখে দেওয়া হলো, তা থেকে পরে কতটা বাড়তি আয় এলো।
- খোলামেলা কথা: খারাপ বছরের ব্যাখ্যা দেয় কি না, ভুল স্বীকার করে কি না, নাকি শুধু ভালো খবর সামনে আনে।
- রিলেটেড পার্টি লেনদেন: পরিচালকদের নিজেদের বা আত্মীয়দের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কেনাবেচা, ঋণ বা ভাড়া কত বড়, আর কোন শর্তে।
- পরিচালকদের শেয়ার আর বেতন: তাঁদের নিজেদের কত শেয়ার আছে, তা বাড়ছে না কমছে, আর কোম্পানির ফলের তুলনায় তাঁদের পারিশ্রমিক কেমন।
- অডিটরের মতামত: অডিট রিপোর্টে কোনো আপত্তি বা "কোয়ালিফাইড" মতামত আছে কি না।
বাংলাদেশে কোন নিয়ম সাহায্য করে
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-র কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড ২০১৮ অনুযায়ী, লিস্টেড কোম্পানির বোর্ডের অন্তত পাঁচ ভাগের এক ভাগ স্বতন্ত্র পরিচালক হতে হয়; চেয়ারম্যান আর এমডি/সিইও আলাদা ব্যক্তি হতে হয়; অডিট কমিটির প্রধান হন একজন স্বতন্ত্র পরিচালক। এমডি/সিইও আর সিএফও-কে লিখিতভাবে জানাতে হয় যে আর্থিক বিবরণী সঠিক, আর ডিরেক্টরস রিপোর্টে রিলেটেড পার্টি লেনদেনের বিস্তারিত দিতে হয়।
এ ছাড়া বিএসইসির ২০১১ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৩০% শেয়ার ধরে রাখতে হয়। এসব তথ্য অ্যানুয়াল রিপোর্টে আর ডিএসই-র ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। নিয়মগুলো বদলাতে পারে, তাই সর্বশেষটা বিএসইসির ওয়েবসাইটে দেখে নিন। আর মনে রাখবেন, কাগজে নিয়ম মানা মানেই ভালো পরিচালনা নয়।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক "রূপসা ফুডস লিমিটেড" নামের একটা কাল্পনিক কোম্পানি পাঁচ বছরে মোট ৫০ কোটি টাকা মুনাফা ডিভিডেন্ড না দিয়ে ব্যবসায় রেখে দিয়েছে।
- একই সময়ে তার বার্ষিক মুনাফা ২০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ কোটি টাকা। বাড়তি মুনাফা: ১ কোটি টাকা।
- রেখে দেওয়া টাকার ওপর রিটার্ন: ১ কোটি ÷ ৫০ কোটি = বছরে মাত্র ২%। শেয়ারহোল্ডাররা নিজেরা টাকাটা পেলে নিরাপদ জায়গাতেই হয়তো এর চেয়ে বেশি পেতেন।
- উল্টো দিকে, বাড়তি মুনাফা যদি ১০ কোটি টাকা হতো, রিটার্ন হতো ১০ ÷ ৫০ = ২০%, যা মুনাফা রেখে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেয়।
ফল: এই সহজ হিসাব দেখায় ম্যানেজমেন্ট শেয়ারহোল্ডারের টাকা কতটা কাজে লাগাচ্ছে। তবে বড় বিনিয়োগের ফল আসতে কয়েক বছর লাগতে পারে, আর এক-দুই বছরের বিশেষ ঘটনা হিসাব ঘুরিয়ে দিতে পারে, তাই কারণগুলোও পড়ুন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- মিডিয়ায় উপস্থিতি, বক্তৃতা বা পরিচিত নাম দেখে ম্যানেজমেন্টকে ভালো ধরে নেওয়া।
- এজিএম-এ দেওয়া প্রতিশ্রুতি পরে মিলিয়ে না দেখা।
- রিলেটেড পার্টি লেনদেন আর অডিটরের মন্তব্যের অংশ এড়িয়ে যাওয়া।
- শুধু ম্যানেজমেন্ট দেখে ব্যবসার দুর্বল অর্থনীতি উপেক্ষা করা।
ম্যানেজমেন্টকে কথায় নয়, কাজে বিচার করুন: আগের প্রতিশ্রুতি, রেখে দেওয়া মুনাফার ফল, আর নিজেদের সঙ্গে লেনদেন, এই তিনটাই সবচেয়ে বেশি বলে।