কনফার্মেশন বায়াস কী
কনফার্মেশন বায়াস মানে, মনে একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেলে আমরা সেই ধারণার পক্ষের তথ্যই বেশি খুঁজি, বেশি মনে রাখি আর বেশি বিশ্বাস করি। বিপক্ষের তথ্য সামনে এলে সেটাকে "ব্যতিক্রম", "গুজব" বা "ওরা বোঝে না" বলে পাশে সরিয়ে রাখি। এটা ইচ্ছা করে করা মিথ্যা নয়; মন নিজে থেকেই এভাবে কাজ করে।
ইনভেস্টমেন্টে বিপদটা হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমরা আর প্রশ্ন করি না, শুধু প্রমাণ জোগাড় করি। ফলে ভুল ধারণা যত দিন যায় তত বেশি "নিশ্চিত" মনে হয়, অথচ আসল তথ্য হয়তো উল্টো কথা বলছিল।
ধরা যাক রাফি একটা কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন, কারণ এক বন্ধু বলেছিল "এটা সামনে অনেক বাড়বে"। এরপর তিনি ফেসবুক গ্রুপে শুধু সেই পোস্টগুলোই পড়েন যেখানে ওই শেয়ারের প্রশংসা আছে। কোম্পানির লাভ কমেছে, এমন খবর এলে ভাবেন "এটা সাময়িক"। ছয় মাস পরে তাঁর বিশ্বাস আগের চেয়ে দৃঢ়, কিন্তু কোম্পানি সম্পর্কে তিনি আসলে নতুন কিছুই যাচাই করেননি। ঘটনাটা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- ভুল ইনভেস্টমেন্ট ধরে রাখা: বিপক্ষের খবর উপেক্ষা করলে দুর্বল হতে থাকা ইনভেস্টমেন্টও "ঠিক আছে" মনে হয়।
- গুজবে বিশ্বাস: যে গুজব আমাদের আশার সঙ্গে মেলে, সেটা যাচাই না করেই সত্যি মনে হয়।
- বেশি আত্মবিশ্বাস: শুধু পক্ষের তথ্য দেখলে নিজের ধারণাকে আসলের চেয়ে বেশি নিশ্চিত মনে হয়, তাই রিস্কও বেশি নেওয়া হয়।
- প্রতারণার ফাঁদ: প্রতারকেরা ঠিক সেই কথাগুলোই বলে যা মানুষ শুনতে চায়, আর কনফার্মেশন বায়াস বাকিটা করে দেয়।
গবেষণায় কী দেখা গেছে
১৯৬০ সালে ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী পিটার ওয়াসন একটা সহজ পরীক্ষা করেন। অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়, "২-৪-৬" সংখ্যাগুলো একটা গোপন নিয়ম মানে; নতুন তিনটা সংখ্যা বলে বলে নিয়মটা খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে ধরে নিলেন নিয়মটা "দুই করে বাড়ে" বা "জোড় সংখ্যা", আর শুধু সেই ধারণা মেলে এমন সংখ্যাই (৮-১০-১২) পরীক্ষা করলেন। আসল নিয়ম ছিল আরও সহজ: যেকোনো বাড়তে থাকা তিনটা সংখ্যা। নিজের ধারণা ভুল প্রমাণ করতে পারে, এমন সংখ্যা খুব কম জনই চেষ্টা করেছিলেন।
ইনভেস্টরদের নিয়েও একই রকম ফল পাওয়া গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটা বড় স্টক মেসেজ বোর্ডে ৫০২ জন ইনভেস্টরকে নিয়ে করা এক গবেষণায় (২০১৩) দেখা যায়, তাঁরা নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে এমন পোস্টকেই বেশি মূল্য দেন। যাঁদের মধ্যে এই ঝোঁক বেশি, তাঁরা বেশি ওভারকনফিডেন্ট, বেশি ঘন ঘন কেনাবেচা করেন, আর বাজার থেকে বাস্তবের চেয়ে বেশি রিটার্ন আশা করেন।
আজকের দিনে কেন আরও বেশি
সোশ্যাল মিডিয়া আর ইউটিউব আমাদের সেটাই বেশি দেখায় যা আমরা আগে পছন্দ করেছি। কোনো শেয়ার, কয়েন বা স্কিম নিয়ে কয়েকটা ভিডিও দেখলেই একই ধরনের আরও কনটেন্ট আসতে থাকে। মনে হয় "সবাই তো একই কথা বলছে", অথচ আসলে আমরা নিজেরাই একটা প্রতিধ্বনির ঘরে ঢুকে গেছি।
- মতের মিল থাকা গ্রুপে থাকলে বিপক্ষের যুক্তি প্রায় কানেই আসে না।
- যে শেয়ার বা স্কিমে টাকা দিয়ে ফেলেছেন, সেটার খারাপ খবর পড়তে মন সবচেয়ে বেশি অনিচ্ছুক থাকে।
নিজের ভাবনা যাচাইয়ের কয়েকটা উপায়
- কেনার আগে লিখে রাখুন কেন কিনছেন, আর কোন ঘটনা ঘটলে বুঝবেন আপনার ধারণা ভুল ছিল।
- ইচ্ছা করে বিপক্ষের সবচেয়ে ভালো যুক্তিটা খুঁজুন। যুক্তিটা ভালো করে বুঝিয়ে বলতে না পারলে, বিষয়টা এখনো পুরো বোঝা হয়নি।
- মতামতের চেয়ে তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দিন: কোম্পানির প্রকাশিত রিপোর্ট, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঘোষণা, সংখ্যা।
- এমন কাউকে জিজ্ঞেস করুন যিনি আপনার সঙ্গে একমত নন, আর তাঁর কথা শেষ পর্যন্ত শুনুন।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু সেই খবর আর ভিডিও দেখা, যেগুলো নিজের কেনা শেয়ার বা স্কিমের প্রশংসা করে।
- খারাপ খবরকে সবসময় "সাময়িক" বা "ষড়যন্ত্র" বলে উড়িয়ে দেওয়া।
- অনেক মানুষ একই কথা বলছে বলে সেটাকেই প্রমাণ ধরে নেওয়া।
- কেনার আগে কখনো না ভাবা যে কোন অবস্থায় নিজের সিদ্ধান্ত বদলাবেন।
নিজের ধারণার পক্ষে প্রমাণ খোঁজা সহজ; ইনভেস্টরের আসল কাজ হলো ধারণাটা ভুল হতে পারে কি না, সেটা খোঁজা।