ওভারকনফিডেন্স কী
ওভারকনফিডেন্স হলো নিজের সম্পর্কে অতিরিক্ত ভালো ধারণা: আমি যতটা জানি বলে মনে করি, আসলে ততটা জানি না; আমার আন্দাজ যতটা নিখুঁত ভাবি, ততটা নয়। এটা অহংকারের ব্যাপার নয়; প্রায় সব মানুষের মধ্যেই কম-বেশি থাকে।
সুইডিশ মনোবিজ্ঞানী ওলা সভেনসনের ১৯৮১ সালের একটা গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ৯৩% অংশগ্রহণকারী নিজেকে মাঝামাঝি মানের চালকের চেয়ে দক্ষ চালক ভেবেছিলেন, সুইডেনে ৬৯%। হিসাব অনুযায়ী, মাঝামাঝির ওপরে থাকতে পারেন বড়জোর অর্ধেক মানুষ।
ধরা যাক তানভীর বাজারের এক চাঙ্গা সময়ে প্রথমবার শেয়ার কিনলেন, আর কয়েক মাসে তিনটা শেয়ারেই ভালো লাভ হলো। তিনি ভাবলেন, "আমার বাছাই ভালো।" অথচ সেই সময় বাজারের বেশিরভাগ শেয়ারই উঠছিল। পরের বছর তিনি সঞ্চয়ের বড় অংশ একটা শেয়ারে দিলেন, আর ঘন ঘন কেনাবেচা শুরু করলেন। ভাগ্য আর দক্ষতাকে আলাদা করে না দেখাই এখানে আসল ভুল। ঘটনাটা উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- বেশি লেনদেন: নিজের আন্দাজে বেশি ভরসা থাকলে মানুষ ঘন ঘন কেনাবেচা করে, আর প্রতিবার কমিশন ও অন্যান্য খরচ কাটে।
- ডাইভারসিফিকেশন কম করা: "এই শেয়ারটা নিশ্চিত উঠবে" ভেবে অল্প কয়েকটা শেয়ারে বেশি টাকা রাখা, যাতে একটার ধাক্কাই বড় হয়ে যায়।
- রিস্ক কম করে দেখা: খারাপ কী হতে পারে, তা নিয়ে কম ভাবা, আর ধার করে ইনভেস্ট করার মতো ঝুঁকি নেওয়া।
- ভাগ্যকে দক্ষতা ভাবা: চাঙ্গা বাজারে প্রায় সবাই লাভ করে, তাই কয়েকটা সফল বাছাই থেকে নিজের দক্ষতা সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ।
ওভারকনফিডেন্সের তিন রূপ
- নিজেকে বাড়িয়ে দেখা: নিজের জ্ঞান বা ফল যতটা ভালো, তার চেয়ে ভালো ভাবা। যেমন, নিজের পোর্টফোলিওর রিটার্ন আসলের চেয়ে বেশি মনে রাখা।
- অন্যদের চেয়ে নিজেকে ভালো ভাবা: "বাকিরা ভুল করে, আমি করব না।" চালকদের সেই গবেষণা এরই উদাহরণ।
- অতিরিক্ত নিশ্চয়তা: ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব সরু পরিসরে আন্দাজ করা, যেমন "ছয় মাসে দাম ঠিক ৮০ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে থাকবে", যেখানে আসল অনিশ্চয়তা অনেক বড়।
বেশি লেনদেন, কম রিটার্ন
অর্থনীতিবিদ ব্র্যাড বারবার আর টেরেন্স ওডিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় ডিসকাউন্ট ব্রোকারের ৬৬,৪৬৫টা পরিবারের ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের লেনদেন বিশ্লেষণ করেন। গড় পরিবার বছরে তার পোর্টফোলিওর প্রায় ৭৫% কেনাবেচা করত। যারা সবচেয়ে বেশি লেনদেন করত, তাদের বার্ষিক রিটার্ন ছিল ১১.৪%, যেখানে বাজারের রিটার্ন ছিল ১৭.৯%।
তাঁদের ব্যাখ্যা: লেনদেনের খরচ আর ওভারকনফিডেন্স। মানুষ ভাবে তাদের তথ্য বা বিচার এতটা ভালো যে কেনাবেচার খরচ পুষিয়ে যাবে, কিন্তু গড়ে তা হয় না। সময়, দেশ আর বাজার আলাদা হলেও, প্রতিটি লেনদেনে খরচ কাটার যুক্তিটা বাংলাদেশেও একই।
সূত্র: বারবার ও ওডিন, জার্নাল অব ফাইন্যান্স, ২০০০
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| বছরে রিটার্ন | |
|---|---|
| বাজার | ১৭.৯% |
| সবচেয়ে বেশি লেনদেনকারীরা | ১১.৪% |
নিজেকে যাচাই করার অভ্যাস
- একটা ইনভেস্টমেন্ট ডায়েরি রাখুন: কী কিনলেন, কেন, কী আশা করছেন। পরে মিলিয়ে দেখুন কতগুলো আন্দাজ মিলেছে।
- নিজের রিটার্ন সৎভাবে মাপুন, সব খরচ বাদ দিয়ে, আর একটা সাধারণ মাপকাঠির (যেমন বাজারের সূচক) সঙ্গে তুলনা করুন।
- কেনার আগে ভাবুন, "এক বছর পরে এটা খারাপ হলে, সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ কী হবে?"
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক আপনার পোর্টফোলিও ২,০০,০০০ টাকার। প্রতিটি কেনা বা বেচায় কমিশন ও অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে ০.৫% খরচ হয় (হারটা কাল্পনিক; আপনার ব্রোকারের আসল হার দেখে নিন)।
- বছরে পুরো পোর্টফোলিও ছয়বার বদলালেন: ছয়বার বেচা আর ছয়বার কেনা, মোট ১২টা লেনদেন।
- খরচ = ২,০০,০০০ × ০.৫% × ১২ = ১২,০০০ টাকা, মানে পোর্টফোলিওর ৬%।
ফল: শুধু খরচ পোষাতেই আপনার বাছাইকে বছরে ৬% বাড়তি রিটার্ন দিতে হবে। যে একবার কিনে রেখে দেয়, তার খরচ সেখানে প্রায় ১%। লেনদেন যত বেশি, নিজের দক্ষতার ওপর তত বড় বাজি। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- চাঙ্গা বাজারের লাভকে নিজের দক্ষতা ভাবা, বাজার নিজেই কতটা উঠেছিল তা না দেখে।
- মনে রাখা শুধু সফল বাছাইগুলো, আর ভুলগুলো "দুর্ভাগ্য" বলে ভুলে যাওয়া।
- লেনদেনের খরচ হিসাব না করে ঘন ঘন কেনাবেচা করা।
- "আমি নিশ্চিত" ভেবে সঞ্চয়ের বড় অংশ এক বা দুটো শেয়ারে রাখা, বা ধার করে ইনভেস্ট করা।
নিজের আন্দাজ লিখে রাখুন আর পরে মিলিয়ে দেখুন: নিজের রেকর্ডই ওভারকনফিডেন্সের সবচেয়ে সৎ আয়না।