BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

ইনকাম ও এক্সপেন্স ট্র্যাকিং (আয়-ব্যয়ের হিসাব)

যা মাপা হয় না, তা সামলানোও যায় না। এক-দুই মাস প্রতিটা টাকার হিসাব রাখলেই দেখা যায়, টাকা আসলে কোথায় "হারিয়ে" যায়।

ভিডিও আসছে
মাস শেষে টাকা যায় কোথায়? ইনকাম-এক্সপেন্স ট্র্যাকিং

ট্র্যাকিং কী

ইনকাম ও এক্সপেন্স ট্র্যাকিং মানে একটা নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত এক মাসে, কত টাকা এল আর কত টাকা কোথায় গেল, তার লিখিত হিসাব রাখা। বেতন, ব্যবসার আয়, টিউশনি, রেমিট্যান্স, সব আয়; বাজার, ভাড়া, যাতায়াত, মোবাইল রিচার্জ, চা-নাশতা, সব খরচ।

এটা বাজেট নয়। বাজেট হলো সামনের পরিকল্পনা, আর ট্র্যাকিং হলো যা ঘটেছে তার সৎ ছবি। ভালো বাজেট বানাতে আগে জানতে হয় আপনার টাকা এখন কোথায় যাচ্ছে।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক রাকিব প্রতিদিন অফিসের পাশে দুই কাপ চা আর একটা নাশতা খান, খরচ ৮০ টাকা। প্রতিদিন হিসাবে এটা কিছুই মনে হয় না। কিন্তু মাসে ৩০ দিনে ২,৪০০ টাকা, বছরে প্রায় ২৯,০০০ টাকা। খরচটা খারাপ নয়; সমস্যা হলো, হিসাব না রাখলে রাকিব জানতেই পারতেন না এটা এত বড়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • ইনভেস্ট করার টাকা আসে উদ্বৃত্ত থেকে: আয় থেকে খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে, সেটাই সঞ্চয় আর ইনভেস্টমেন্টের উৎস। উদ্বৃত্ত না জানলে পরিকল্পনাও হয় না।
  • ইমার্জেন্সি ফান্ডের মাপ ঠিক করতে: "ছয় মাসের খরচ" জমাতে হলে আগে জানতে হবে এক মাসের খরচ আসলে কত।
  • নিজের ইনফ্লেশন বুঝতে: আপনার খরচের ঝুড়ি জানলে বোঝা যায় দাম বাড়া আপনাকে কতটা ছুঁয়ে যাচ্ছে।
  • চাপের সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে: আয় কমলে বা চাকরি গেলে কোন খরচ কাটা যায়, তা আগে থেকেই জানা থাকে।

কীভাবে শুরু করবেন

  • একটা মাধ্যম বেছে নিন: খাতা-কলম, মোবাইলের নোট, স্প্রেডশিট বা খরচ লেখার কোনো অ্যাপ। সবচেয়ে ভালো উপায় সেটাই, যা আপনি আসলে প্রতিদিন ব্যবহার করবেন।
  • দিনের খরচ দিনেই লিখুন, রাতে ঘুমানোর আগে দুই মিনিট। মাস শেষে মনে করে লেখা প্রায় সবসময় অসম্পূর্ণ হয়।
  • ব্যাংক আর মোবাইল ওয়ালেটের স্টেটমেন্ট মিলিয়ে দেখুন। ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড নিজে থেকেই থাকে, শুধু নগদ খরচটা আলাদা করে লিখতে হয়।
  • অন্তত দুই-তিন মাস চালিয়ে যান। এক মাসে ঈদ, বিয়ের দাওয়াত বা চিকিৎসার মতো অস্বাভাবিক খরচ পড়লে ছবিটা বিকৃত হতে পারে।

খরচ কীভাবে ভাগ করবেন

খরচগুলো কয়েকটা ভাগে রাখুন। স্থির খরচ প্রতি মাসে প্রায় একই: বাসা ভাড়া, স্কুলের বেতন, লোনের কিস্তি, বাড়িতে পাঠানো টাকা। পরিবর্তনশীল খরচ ওঠানামা করে: বাজার, বিদ্যুৎ-গ্যাস, যাতায়াত, বাইরে খাওয়া। আর অনিয়মিত খরচ বছরে এক-দুবার আসে: ঈদের কেনাকাটা, ভর্তি ফি, বীমার প্রিমিয়াম।

অনিয়মিত খরচ মাসিক হিসাবে প্রায়ই বাদ পড়ে যায়, আর তখনই হঠাৎ টানাটানি হয়। বছরের মোট অনিয়মিত খরচকে ১২ দিয়ে ভাগ করে প্রতি মাসের হিসাবে ধরলে ছবিটা সৎ হয়।

বাংলাদেশের গড় পরিবারের টাকা কোথায় যায়

বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ (হায়েস) ২০২২ অনুযায়ী, একটা পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ৩২,৪২২ টাকা আর গড় মাসিক খরচ ৩১,৫০০ টাকা। খরচের সবচেয়ে বড় অংশ খাবার, মাসে প্রায় ১৩,২০০ টাকা, মোট খরচের প্রায় ৪২%। এরপর বাসা ও ইউটিলিটি (প্রায় ৪,৪০০ টাকা), চিকিৎসা (প্রায় ২,১০০ টাকা) আর পোশাক (প্রায় ২,১০০ টাকা)।

এগুলো গড় হিসাব; শহর-গ্রাম, আয় আর পরিবারের আকার ভেদে ছবিটা অনেক আলাদা। নিজের সংখ্যা এর সঙ্গে তুলনা করতে পারেন, তবে আপনার লক্ষ্য গড়ের মতো হওয়া নয়, নিজের টাকা কোথায় যায় তা জানা।

গড় পরিবারের মাসিক খরচ কোথায় যায়মোট প্রায় ৩১,৫০০ টাকা
খাবার
১৩,১৯৩ টাকা
অন্যান্য সব
৯,৭১১ টাকা
বাসা ও ইউটিলিটি
৪,৪১৮ টাকা
চিকিৎসা
২,১১৫ টাকা
পোশাক
২,০৬৩ টাকা

সূত্র: বিবিএস, খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ (প্রথম আলো ইংলিশ ও দ্য ডেইলি স্টার, ডিসেম্বর ২০২৩)

সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
মাসিক খরচ
খাবার১৩,১৯৩ টাকা
অন্যান্য সব৯,৭১১ টাকা
বাসা ও ইউটিলিটি৪,৪১৮ টাকা
চিকিৎসা২,১১৫ টাকা
পোশাক২,০৬৩ টাকা

হাতে-কলমে হিসাব

এক মাসের হিসাব (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)
  1. ধরা যাক মাসিক আয় ৪০,০০০ টাকা। আপনার ধারণা, মাস শেষে ৮,০০০ টাকা বাঁচে।
  2. বড় খরচগুলো লিখলেন: ভাড়া ১২,০০০, বাজার ৯,০০০, বাড়িতে পাঠানো ৪,০০০, যাতায়াত ৩,০০০, বিদ্যুৎ-গ্যাস-ইন্টারনেট ৩,০০০। মোট ৩১,০০০ টাকা।
  3. এক মাস ছোট খরচও লিখলেন: চা-নাশতা ২,৪০০, অনলাইনে খাবার অর্ডার ২,৮০০, সাবস্ক্রিপশন ও বাড়তি ডেটা ৮০০। মোট ৬,০০০ টাকা।
  4. মোট খরচ ৩৭,০০০ টাকা। আসলে বাঁচে ৩,০০০ টাকা, ধারণার চেয়ে ৫,০০০ টাকা কম।

ফল: "হারানো" টাকা বড় খরচে নয়, ছোট ছোট খরচে। কোনটা রাখবেন আর কোনটা কমাবেন, সেটা আপনার সিদ্ধান্ত; কিন্তু সিদ্ধান্তটা এখন জেনে-বুঝে নেওয়া যায়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • শুধু বড় খরচ লেখা। ছোট, প্রতিদিনের খরচ মিলেই প্রায়ই সবচেয়ে বড় অঙ্ক হয়।
  • ঈদ, ভর্তি বা বীমার মতো বছরে একবারের খরচ মাসিক হিসাবে না ধরা।
  • প্রথম মাসেই খুব কঠিন নিয়ম বানিয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া। প্রথম কাজ শুধু দেখা, বিচার করা নয়।
  • শুধু নিজের খরচ দেখা, পরিবারের যৌথ খরচ বা অন্যের হয়ে দেওয়া টাকা বাদ দেওয়া। সংসারের পুরো ছবি দরকার।
মনে রাখুন

বাজেট, সঞ্চয়, ইনভেস্টমেন্ট, সবকিছুর শুরু একটা প্রশ্ন দিয়ে: আমার টাকা আসলে কোথায় যায়? দুই-তিন মাস সৎভাবে লিখলেই উত্তর পাবেন।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
গড় মাসিক আয় ৩২,৪২২ টাকা ও খরচ ৩১,৫০০ টাকা (হায়েস ২০২২, বিবিএস): দ্য ডেইলি স্টার, "Household income doubles in 6 years, so does spending", ডিসেম্বর ২০২৩ ↗
খাতভিত্তিক খরচ (খাবার ১৩,১৯৩ টাকা, বাসা ও ইউটিলিটি ৪,৪১৮, চিকিৎসা ২,১১৫, পোশাক ২,০৬৩; হায়েস ২০২২): প্রথম আলো ইংলিশ, "Families spend 42pc of income on food", ডিসেম্বর ২০২৩ ↗
জরিপের পদ্ধতি: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।