বন্ড কী
বন্ড একটা ঋণপত্র, অনেকটা আইওইউ বা "হাতচিঠা"-র মতো। যে টাকা ধার নেয় (ইস্যুকারী), সে লিখিত কথা দেয়: এত টাকা নিলাম, প্রতি নির্দিষ্ট সময়ে এত হারে সুদ দেব, আর অমুক তারিখে পুরো টাকা ফেরত দেব। সরকার রাস্তা-বিদ্যুৎ বা বাজেটের ঘাটতির জন্য, আর কোম্পানি ব্যবসা বাড়াতে বন্ড ছাড়ে।
বন্ড কিনলে আপনি ঋণদাতা, মালিক নন। শেয়ার কিনলে আপনি কোম্পানির ছোট্ট একটা অংশের মালিক হন, লাভ বাড়লে আপনারও ভাগ বাড়ে। বন্ডে লাভ যতই হোক, আপনি পাবেন শুধু প্রতিশ্রুত সুদ আর মূল টাকা; বিনিময়ে টাকা ফেরতের দাবিতে আপনি শেয়ারহোল্ডারের আগে থাকেন।
ধরা যাক আপনার চাচাতো ভাই দোকান বড় করতে আপনার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নিলেন, আর একটা কাগজে লিখে দিলেন: "প্রতি ছয় মাসে ৫,০০০ টাকা দেব, তিন বছর পরে ১ লাখ ফেরত।" এক বছর পরে আপনার হঠাৎ টাকা দরকার হলো। আপনি কাগজটা এক বন্ধুর কাছে বিক্রি করলেন; এখন থেকে কিস্তি আর শেষের ১ লাখ পাবেন বন্ধু। বন্ড ঠিক এভাবেই কাজ করে, শুধু কাগজটা আনুষ্ঠানিক আর বাজারে কেনাবেচা হয়। ঘটনাটা উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- নিয়মিত আয় বুঝতে: বন্ড থেকে কবে কত টাকা আসবে, তা শুরু থেকেই জানা থাকে, যদি ইস্যুকারী কথা রাখে।
- পরিচিত জিনিস চিনতে: ট্রেজারি বন্ড, কর্পোরেট বন্ড, সুকুক, এমনকি সঞ্চয়পত্রও একই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে: সরকার বা কোম্পানিকে ধার।
- পোর্টফোলিওতে ভারসাম্য বুঝতে: শেয়ারের তুলনায় বন্ডের আয় বেশি নির্দিষ্ট, তাই অনেকে দুটো মিলিয়ে রাখেন।
- রিস্ক ঠিকভাবে দেখতে: "নির্দিষ্ট সুদ" মানে "ঝুঁকি নেই" নয়; ইস্যুকারী টাকা না দিলে বা আগে বিক্রি করতে হলে লোকসান হতে পারে।
একটা বন্ডের চারটি মূল অংশ
- ইস্যুকারী: কে ধার নিচ্ছে, সরকার না কোম্পানি। টাকা ফেরতের ভরসা পুরোটাই ইস্যুকারীর সামর্থ্যের ওপর।
- ফেস ভ্যালু (গায়ের দাম বা পার ভ্যালু): মেয়াদ শেষে যে অঙ্ক ফেরত দেওয়ার কথা। যেমন, বাংলাদেশ সরকারের ট্রেজারি বন্ড কেনা যায় ১ লাখ টাকা আর তার গুণিতকে।
- কুপন: ফেস ভ্যালুর ওপর বছরে কত হারে সুদ, আর কত দিন পরপর দেওয়া হবে। বাংলাদেশের ট্রেজারি বন্ডে কুপন দেওয়া হয় ছয় মাস পরপর। কিছু বন্ডে মাঝে কোনো কুপনই নেই (জিরো-কুপন): কম দামে কিনে মেয়াদ শেষে পুরো ফেস ভ্যালু পাওয়া।
- মেয়াদ: কবে মূল টাকা ফেরত আসবে। বাংলাদেশের ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদ ২, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর; ট্রেজারি বিল এক বছরের কম।
ইস্যু থেকে মেয়াদপূর্তি: একটা বন্ডের জীবন
প্রথমে ইস্যুকারী বন্ড বিক্রি করে টাকা তোলে; একে বলে প্রাইমারি মার্কেট। বাংলাদেশে সরকারের হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামে ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে, আর কোম্পানির বন্ড ইস্যু হয় বিএসইসির অনুমোদন নিয়ে। এরপর মেয়াদ পর্যন্ত কুপন আসতে থাকে, আর শেষ দিনে ফেস ভ্যালু ফেরত আসে।
মাঝপথে টাকা লাগলে বন্ড অন্য কারও কাছে বিক্রি করা যায়; একে বলে সেকেন্ডারি মার্কেট। তখন দাম আর ফেস ভ্যালু এক নাও হতে পারে: বাজারে সুদের হার আর ইস্যুকারীর প্রতি আস্থা অনুযায়ী দাম বেশি বা কম হয়। সঞ্চয়পত্র এখানে আলাদা: এটা বাজারে কেনাবেচা হয় না, আগে টাকা লাগলে সরকারের কাছেই কম মুনাফায় ভাঙাতে হয়।
বন্ডের রিস্ক কোথায়
- ক্রেডিট বা ডিফল্ট রিস্ক: ইস্যুকারী সময়মতো সুদ বা আসল দিতে না পারার ঝুঁকি। ক্রেডিট রেটিং এই ঝুঁকির একটা আন্দাজ দেয়, নিশ্চয়তা নয়।
- ইন্টারেস্ট রেট রিস্ক: বাজারে সুদের হার বাড়লে আগের নির্দিষ্ট কুপনের বন্ডের দাম কমে। মেয়াদ পর্যন্ত রাখলে এটা কাগজে থাকে, আগে বেচলে আসল লোকসান।
- লিকুইডিটি রিস্ক: দরকারের দিন ন্যায্য দামে ক্রেতা না মেলার ঝুঁকি।
- ইনফ্লেশন রিস্ক: কুপন নির্দিষ্ট, কিন্তু দাম বাড়তে থাকলে সেই কুপনের কেনার ক্ষমতা কমে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ১,০০,০০০ টাকা ফেস ভ্যালুর একটা বন্ড, কুপন বছরে ১০%, ছয় মাস পরপর দেওয়া হয়, মেয়াদ ৩ বছর। প্রতি ছয় মাসে কুপন = ১,০০,০০০ × ১০% ÷ ২ = ৫,০০০ টাকা।
- তিন বছরে ছয়টি কুপন: ৬ × ৫,০০০ = ৩০,০০০ টাকা।
- মেয়াদ শেষে ফেস ভ্যালু ফেরত ১,০০,০০০ টাকা। কর বাদ দিলে মোট প্রাপ্তি ১,৩০,০০০ টাকা।
ফল: ইস্যুকারী কথা রাখলে আর মেয়াদ পর্যন্ত রাখলে কবে কত আসবে, তা প্রথম দিনেই জানা যায়। মাঝপথে বেচলে অবশ্য দাম বাজারের ওপর নির্ভর করে। হার আর অঙ্ক উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- বন্ড আর শেয়ার গুলিয়ে ফেলা। বন্ডে আপনি ঋণদাতা, কোম্পানির লাভ বাড়লেও আপনার আয় বাড়ে না।
- "নির্দিষ্ট সুদ" দেখে ভাবা যে কোনো ঝুঁকি নেই। ইস্যুকারী টাকা না দিতে পারলে বা আগে বেচতে হলে লোকসান হতে পারে।
- ধরে নেওয়া যে মেয়াদের আগে যেকোনো দিন ফেস ভ্যালুতে বেচা যাবে।
- শুধু কুপনের হার দেখা, কে ইস্যু করছে আর তার টাকা ফেরতের সামর্থ্য না দেখা।
বন্ড মানে লিখিত ধার: চারটি জিনিস দেখুন, কে নিচ্ছে, কত ফেরত দেবে, কত হারে সুদ দেবে আর কবে; আর মনে রাখুন মাঝপথে বেচলে দাম বাজার ঠিক করে।