লোন আসলে কী
লোন নিলে আপনি আজ এমন টাকা খরচ করেন, যা আপনি এখনো আয় করেননি। বিনিময়ে ভবিষ্যতের প্রতি মাসের আয়ের একটা অংশ আগেই বাঁধা পড়ে যায়, আর সঙ্গে দিতে হয় সুদ। তাই প্রতিটি লোন আসলে একটা প্রশ্ন: আজকের এই জিনিসটা কি ভবিষ্যতের ওই টাকার চেয়ে বেশি মূল্যবান?
সাধারণভাবে "ভালো লোন" বলা হয় সেটাকে, যা দিয়ে এমন কিছু কেনা বা গড়া হয় যা ভবিষ্যতে আয় বাড়ায় বা দীর্ঘদিন মূল্য ধরে রাখে, আর যার খরচ সামলানো যায়। "খারাপ লোন" সেটা, যা দিয়ে এমন খরচ চলে যা লোন শোধ হওয়ার অনেক আগেই শেষ হয়ে যায়, বিশেষ করে চড়া সুদে।
ধরা যাক দুই বন্ধু, তুহিন আর শাওন, দুজনেই ৫০,০০০ টাকা ধার নিলেন। তুহিন সেই টাকায় একটা সেলাই মেশিন কিনে বাসায় ছোট কাজ শুরু করলেন, যার আয় থেকে কিস্তি যায়। শাওন বিয়ের দাওয়াতে পরার জন্য দামি পোশাক আর একটা নতুন ফোন কিনলেন; জিনিসগুলোর দাম এক বছরেই কমে গেল, কিস্তি চলল আরও এক বছর। ঘটনা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- লোনের সুদ একটা "নিশ্চিত উল্টো রিটার্ন": ২০% সুদের লোন রেখে ১০% রিটার্নের ইনভেস্টমেন্ট করলে আসলে আপনি পিছিয়ে যাচ্ছেন।
- কিস্তি সঞ্চয়ের জায়গা খেয়ে ফেলে: প্রতি মাসে যত বেশি টাকা কিস্তিতে যায়, ইনভেস্ট বা ইমার্জেন্সি ফান্ড গড়ার জন্য তত কম থাকে।
- লিভারেজের রিস্ক বুঝতে: ধার করা টাকায় লাভ বড় হয়, কিন্তু লোকসানও বড় হয়, আর লোকসান হলেও কিস্তি থামে না।
- ক্রেডিট রেকর্ড রক্ষা করতে: কিস্তি বাকি পড়লে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবিতে উঠে যায়, যা পরে লোন বা ক্রেডিট কার্ড পাওয়া কঠিন করে।
তিনটি প্রশ্ন
"ভালো" নামের লোনও খারাপ হতে পারে। পড়াশোনা বা ব্যবসার লোন চড়া খরচে নিলে, বা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বড় নিলে, সেটাও বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আবার জরুরি চিকিৎসার জন্য নেওয়া লোন আয় না বাড়ালেও কখনো কখনো একমাত্র উপায়।
- টাকাটা কী কাজে লাগবে? এমন কিছু কি কেনা হচ্ছে, যা আয় বাড়াবে (দক্ষতা, ব্যবসার যন্ত্রপাতি) বা দীর্ঘদিন মূল্য ধরে রাখবে, নাকি এমন খরচ যা দ্রুত শেষ হয়ে যাবে?
- লাভ কি খরচের চেয়ে বেশি? লোনের পুরো খরচ (সুদ, ফি, চার্জ সব মিলিয়ে) আর সেই টাকা থেকে আসা সম্ভাব্য আয় বা সাশ্রয় পাশাপাশি রেখে দেখা।
- খারাপ সময়েও শোধ করা যাবে? আয় কমে গেলে, চাকরি গেলে বা ব্যবসা ধীর হলে কিস্তি চালানো সম্ভব কি না। যে লোন শুধু সবকিছু ঠিকঠাক চললেই শোধ হয়, সেটা ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশে ধারের খরচ কেমন
এপ্রিল ২০২০ থেকে জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত ব্যাংক লোনের সুদে ৯%-এর সীমা ছিল। সীমা উঠে যাওয়ার পর হার বাজারভিত্তিক হয় এবং বেড়ে যায়; বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জুন ২০২৬-এ ব্যাংকগুলোর গড় লেন্ডিং রেট ছিল ১১.৮৬%।
অন্য ধারের খরচ সাধারণত আরও বেশি। ক্রেডিট কার্ডে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সুদ বছরে ২৫% (জানুয়ারি ২০২৫ থেকে)। ক্ষুদ্রঋণে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সর্বোচ্চ সার্ভিস চার্জ ২৪% (২০১৯ থেকে)। মহাজন বা অনানুষ্ঠানিক ধারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, খরচ অনেক সময় এর চেয়েও অনেক বেশি। এই সীমা ও হারগুলো সময়ের সঙ্গে বদলায়।
কতটা লোন সামলানো যায়
একটা সহজ মাপ হলো, মাসের আয়ের কত অংশ সব কিস্তিতে যাচ্ছে। অংশটা যত বড়, আয় একটু কমলেই তত বিপদ। অনেকে নিজের জন্য একটা সীমা ঠিক করে রাখেন, আর নতুন লোন নেওয়ার আগে দেখেন সেটা ওই সীমা পার করছে কি না।
আর লোন নেওয়ার আগে ইমার্জেন্সি ফান্ড থাকাটা জরুরি। না থাকলে প্রথম বিপদেই কিস্তি বাকি পড়ে, আর একটা লোন শোধ করতে আরেকটা নেওয়ার চক্র শুরু হয়।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ১,০০,০০০ টাকা এক বছরের জন্য ধার নিলেন, মোট খরচ (সুদ ও ফি) প্রায় ৭,০০০ টাকা। ফেরত দিতে হবে প্রায় ১,০৭,০০০ টাকা।
- ক্ষেত্র ক: টাকাটা দিয়ে একটা কোর্স করলেন, যার পর মাসে ৩,০০০ টাকা আয় বাড়ল। বছরে বাড়তি আয় ৩৬,০০০ টাকা, খরচের চেয়ে অনেক বেশি, আর আয়টা পরের বছরগুলোতেও থাকে।
- ক্ষেত্র খ: টাকাটা দিয়ে একটা ফোন কিনলেন। কোনো আয় আসে না, আর এক বছর পর ফোনটার বাজারদাম হয়তো অর্ধেক। আপনি ১,০৭,০০০ টাকা দিলেন এমন জিনিসের জন্য, যার দাম এখন প্রায় ৫০,০০০ টাকা।
ফল: লোন একই, খরচও একই; পার্থক্যটা টাকা কী কাজে লাগল তাতে। তবে ক্ষেত্র ক-ও তখনই ভালো, যখন আয় বাড়ার সম্ভাবনা বাস্তবসম্মত। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু মাসিক কিস্তি দেখে লোন নেওয়া, মোট খরচ না দেখা।
- "ভালো লোন" নাম দেখেই ধরে নেওয়া যে সেটা লাভজনক হবে, আয় বাড়ার হিসাব যাচাই না করা।
- ধার করা টাকায় শেয়ার বা অন্য ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসে ইনভেস্ট করা, লোকসান হলে কিস্তি কোথা থেকে আসবে না ভেবে।
- একটা লোন শোধ করতে আরেকটা চড়া সুদের লোন নেওয়া।
লোন নেওয়ার আগে তিনটি প্রশ্ন: টাকাটা কী কাজে লাগবে, লাভ কি পুরো খরচের চেয়ে বেশি, আর খারাপ সময়েও শোধ করা যাবে কি না।